FriendsDiary.NeT | Friends| Inbox | Chat
Home»Archive»

টেঙ্গা মসজিদ – শ্যামনগর, সাতক্ষীরা

টেঙ্গা মসজিদ – শ্যামনগর, সাতক্ষীরা

*

বঙ্গের বীরপুত্র, বাংলার বারভূইয়ার অগ্রগণ্য, যশোরাধিপতি মহারাজা প্রতাপাদিত্যের (রাজত্বকাল ১৫৮৪ খ্রীঃ – ১৬০৯ খ্রীঃ) নৌ-বাহিনী প্রধান খোজা কমল/খাজা কামাল রাজধানী ঈশ্বরীপুরে একটি ‘টেঙ্গা’ প্রতিষ্ঠা করেন। টেঙ্গা ফার্সী শব্দ যার অর্থ ‘সেনাছাউনি/ছাউনি’। ছাউনি থেকে আধা কিলোমিটার দূর দিয়ে বয়ে যাওয়া কদমতলী নদীর পাশে এবং নিকটবর্তী ধুমঘাট নৌ-দূর্গের সৈনিকদের জন্য এই ছাউনি গড়ে তোলা হয়েছিল বলেই প্রতীয়মান হয়। তার বাহিনীতে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন ধর্মাবল্বীদের মধ্যে মুসলমান সৈনিকরাও ছিল। সময়ের প্রয়োজনে সৈনিকদের পাশাপাশি পাঠান, মুসলমান প্রজা ও অতিথিদের জন্য পরবর্তীতে এই সেনাছাউনিতে একটি পাকা মসজিদ তৈরী করা হলে তা ‘টেঙ্গা মসজিদ’ হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠে। যেমনটি দেখা যায় আমাদের সেনানিবাসগুলোর ‘গ্যারিশন মসজিদ’ – তেমনটি আর কি!

সাতক্ষীরা-কলারোয়া-শ্যামনগর মহাসড়কের ঈশ্বরীপুর মোড় থেকে আনুমানিক ২৫০ মিটার পূর্বদিকে শ্যামনগর উপজেলার বংশীপুর গ্রামে টেঙ্গা মসজিদ অবস্থিত। মসজিদটি অত্যন্ত জীর্ণাবস্থায় উদ্ধার করা হলে গ্রামের নামে মসজিদটি ‘বংশীপুর ঐতিহাসিক শাহী মসজিদ’ নামে নামকরণ করা হয়। মসজিদটি কবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল তা নিয়ে মতভেদ আছে। সাতক্ষীরা২৪নিউজ.কম থেকে জানা যায়, “সুন্দরবন অঞ্চলের হাবসি শাসনকর্তা কর্তৃক ১৪৬০ – ১৪৮০ খ্রীঃ মধ্যে মসজিদটি নির্মিত হয়”; আবার অনেকে মনে করেন মসজিদটি পাঠান আমলে তৈরী, বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন বলছে মসজিদটি ১৫৯৯ খ্রীঃ তৈরী – তবে এসব তথ্যের স্বপক্ষে কোন সূত্র বা উপযুক্ত/নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। বাঙলাদেশের প্রত্নসম্পদ বইয়ে মসজিদটি ষোড়শ শতাব্দীর শেষ দশক অথবা সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম দশকে নির্মিত বলে ধারনা করা হয়েছে। অপরদিকে, মসজিদটি মুঘল নৃপতি আকবরের সেনাপতি মানসিংহ তৈরী করেছিলেন বলে শোনা যায়। যদিও আকবর তার শাসন আমলে মানে ১৫৫৬ খ্রীঃ থেকে ১৬০৫ খ্রীঃ পর্যন্ত বাঙলার এই অঞ্চল নিজ শাসনের অধীন করতে পারেননি। তথাপি বিষয়টির স্বপক্ষে এভাবে যুক্তি দেওয়া যায় যে, ১৬০৩ খ্রীঃ মানসিংহ প্রতাপাদিত্যের রাজ্য যশোর আক্রমণ করে এবং ১৬০৪ খ্রীঃ সন্ধি করে ফিরে যায়। আবার ১৬০৫-৬ খ্রীঃ দিকে ৮ মাসের জন্য পুনরায় বাঙলায় প্রত্যাবর্তন করে। সুতরাং মসজিদের গায়ে “প্রতিষ্ঠাকালঃ মোঘল সম্রাট মহামতি আকবর এর শাষনামল” যেমনটি লেখা রয়েছে তা দিন-তারিখের হিসাবে সঠিক বলা চলে। মসজিদ প্রতিষ্ঠাকারী খোজা কমল ১৬০৯/১০ খ্রীঃ সুবাহদার ইসলাম খাঁর প্রেরিত মুঘল বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করার সময় বীরবিক্রমে যুদ্ধ করে মৃত্যূমূখে পতিত হন (বাঙলার অকুতোভয় এই মহান বীরের প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা)।ফলে মসজিদ নির্মাণ করে থাকলে তিনি তা এই সময়ের আগেই করেছিলেন মানে সম্রাট আকবরের আমলেই। তবে এমনও হতে পারে, প্রতাপের পতনের (১৬০৯ খ্রীঃ মুঘল বাহিনীর কাছে তিনি আটক হন) পর ১৬১২ খ্রীঃ দিকে বাঙলার সুবাহদার ইসলাম খাঁর নিযুক্ত মুঘল ফৌজদারের কেউ মসজিদটি নির্মাণ করে থাকতে পারেন।


টেঙ্গা মসজিদ – প্রাথমিক সংস্কারের পর
মসজিদের কোন শিলালিপি না পাওয়ায় বা নির্মাণের তারিখ কারোর জানা না থাকায় এবং পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে তবে স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করে ধারনা করা যায় এটি মুঘলামলের কীর্তি – কার্নিশ ও বপ্র, ছোট ছোট ইট, টেরাকোটার কারুকাজের পরিবর্তে পলেস্তারর উপর নকশা ইত্যাদিতে মুঘল বৈশিষ্ট্য ও স্থাপত্যশৈলীর ছাপ লক্ষ্য করা যায়। তবে গম্বুজগুলো খানজাহানী গম্বুজের অনুকরণে নির্মিত যেখানে সুলতানি যুগের বাংলার ইটের পেন্ডেন্টিভ ব্যবহৃত হয়েছে। প্রতাপাদিত্যের পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরী একই স্থানের মানে ঈশ্বরীপুরের বারদুয়ারী প্রাসাদ ও যশোরেশ্বরী মন্দিরের ইট ও কারুকাজময় ইটের সাথে এই মসজিদের ইটের মিল রয়েছে। খুব জোরাল প্রমাণ না থাকালেও পারিপার্শ্বিক নিয়ামকসমূহ বিবেচনা করে মসজিদটি মুঘল স্থাপত্যশৈলীতে মহারাজা প্রতাপাদিত্যের পৃষ্ঠপোষকতায় সম্ভবতঃ ১৭ শতাব্দীতে নির্মিত বলেই ধরে নিলাম।

সুন্দরবন সংলগ্ন মহারাজা প্রতাপাদিত্যের রাজ্যের ২টি মসজিদ এখনো টিকে আছে। টেঙ্গা মসজিদ এর মধ্যে একটি। শুধু প্রাচীনত্বের কারণেই নয় বরং এই মসজিদ এর ভূমি নকশা ও এক সারিতে ৫ গম্বুজ থাকার কারণেও বাংলাদেশের প্রত্ন ঐতিহ্যের বিরল নিদর্শন হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এ পর্যন্ত প্রাচীন বাঙলার মাত্র ২টি ৫ গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদের সন্ধান পাওয়া গেছে।


বেগম বাজার জামে/করতলব/কারতালাব খান মসজিদ – ঢাকা
ঢাকার ৬২, বেগম বাজার রোডে বাংলাদেশে মুঘলামলের সব থেকে বড় মসজিদ বেগম বাজার জামে/করতলব/কারতালাব খান মসজিদ (স্থাপিতঃ ১৭০১ – ১৭০৪ খ্রীঃ) ৫ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদের অপর নিদর্শন হিসাবে এখনো আমাদের সামনে টিকে আছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, টেঙ্গা মসজিদ বাঙলায় নির্মিত এক সারিতে ৫ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ স্থাপনার সর্বপ্রাচীন নিদর্শন। অভিজ্ঞরা বলছেন, সম্ভবতঃ বাঙলায় ৩ গম্বুজ বিশিষ্ট যে সব মসজিদ ছিল তারই সম্প্রসারিত রূপ ৫ গম্বুজের এই মসজিদ ২টি। যাহোক, ভারতবর্ষে এরূপ নিদর্শনের দৃষ্টান্ত আরো দেখতে পাওয়া যায় যেমন ভারতের দিল্লীর ‘বড় গম্বুজ মসজিদ (১৪৯৪ খ্রীঃ)’ কিংবা ‘মথ-কি-মসজিদ (১৫০০ খ্রীঃ)’ ও পাটনার ‘চান্নিঘাট মসজিদ’।

ভূমি বিন্যাসে টেঙ্গা মসজিদটি আয়তকার, উত্তর-দক্ষিণে লম্বা, দৈর্ঘ্য ৪১.৪৫ মিটার ও প্রস্থ ১০.০৬ মিটার। পূর্ব দেওয়ালে ৫টি আর উত্তর ও দক্ষিণ দিকে ১টি করে ২টি পত্রাকারের খিলানযুক্ত দরজা আছে। মাঝের দরজাটি অন্যগুলো থেকে খানিকটা বড়, এর প্রশস্ততা ২.২৩ মিটার আর অন্যগুলো ১.৯২ মিটার করে। কোন জানালা দেখলাম না তবে মিহরাবসমূহের উপরে আধা-পত্রফলকের মত অংশ খালী রাখা হয়েছে যেখান দিয়ে দিনের বেলায় সূর্যের আলো এসে নামায কক্ষগুলোকে আলোকিত করে রাখে। দেওয়ালের পুরুত্ব গোটা মসজিদের সবখানেই ২.১৩ মিটার। মসজিদের ভিতরের অংশ ৫টি বর্গাকার প্রকোষ্ঠে ভাগ করা। মাঝখানেরটি আকারে খানিকটা বড় আর প্রতি পাশে যে ২টি করে ঘর রয়েছে সেগুলো খানিকটা ছোট। বড়টি/মাঝেরটির প্রতিবাহু ৬.৩৭ মিটার পরিমাপের আর ছোট ঘরগুলোর প্রতিবাহু ৫.৭০ মিটার করে (সংষ্কারের পর সামান্য পরিবর্তন হতে পারে)।দু’ঘরের মাঝে আক্ষিক খিলানের সংযোগ পথ রয়েছে ফলে উত্তর বা দক্ষিণের যে কোন পাশে দাঁড়ালে সামনের অংশটি সরু প্যাসেজের মত দেখতে লাগে। মজার ব্যাপার হল, মসজিদের প্রতিটি দরজা দিয়ে প্রবেশ করলেই মনে হবে আলাদা একেকটি ছোট মসজিদে ঢুকছি। দেওয়ালে কুলুঙ্গি ছিল কিনা তা টাইলস দ্বারা আবৃত করে ফেলায় এবং বর্তমান মুয়াজ্জিন সাহেবকে জিঙ্গাসা করেও বুঝতে বা জানতে পারলাম না।

*




0 Comments 37 Views
Comment

© FriendsDiary.NeT 2009- 2019