FriendsDiary.NeT | Friends| Inbox | Chat
Home»Archive»

রবীন্দ্র কমপ্লেক্স – দক্ষিণডিহি, খুলনা

রবীন্দ্র কমপ্লেক্স – দক্ষিণডিহি, খুলনা

*

রবীন্দ্রনাথ, বাঙ্গালী ও বাংলাদেশ এক নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ… আজ রবীন্দ্রনাথের ১৫৭তম জম্মদিবস। বিশ্বকবির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধায় নিবেদিত…

অনিবার্য কারণ বশতঃ আমার আজকের কর্মসূচীর পূর্ব পরিকল্পনা গত রাতেই বাতিল করতে হয়েছিল। অকস্মাৎ হাতে বেশ খানিকটা সময় ‘মেঘ না চাইতেই জল’র মতো চলে এলো। তাই বলে তো শুয়ে-বসে দিনটি আর পার করা যায় না! অযথা দেরী না করে ঘর থেকে তাই বের হয়ে এলাম। রাস্তা-ঘাটও বেশ ফাঁকা-ফাঁকা। মহাসড়কের গতিময় তান্ডব আজ স্থবির, ম্রীয়মান, গায়ে জোর-নেই জোর-নেই ভাব। দু’একটা মোটর গাড়ী হু-উ-শ করে পাশ কেটে যাচ্ছে বটে, তবে তাতে কিসের যেনো ‍একটা কমতি আছে – ঐ যে দাপুটে-দাপুটে কেমন একটা ভাব থাকে নাহ!! আমার বেশ সুবিধেই হলো, একটু আরাম করে, নিরিবিলি পথ-ঘাট দেখতে দেখতে এগোতে থাকলাম। এপথ আমার বহু পরিচিত, আমার খুউব আপন। আমার আশৈশব-কৈশোরের বহু প্রত্যাশা, আনন্দ, বেদনা, চঞ্চলতা, ব্যকুলতার আসমুদ্র স্মৃতিতে ভরা এই মহাসড়ক। ছোটবেলায় ফি-বছর খুলনা-যশোর মহাসড়কের এ পথ ধরেই যে শীত বা গরমের ছুটিতে নানাবাড়ি যেতাম। আজ অবশ্য গন্তব্য নিকটেই… দক্ষিণডিহি, বেণীমাধব রায়চৌধুরীর বাড়ি।

বেণীমাধবকে আপনারা সবাই হয়তো এক্ষুনি চিনতে পারবেন না। তিনি সম্ভবত উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে খুলনা জেলার ফুলতলা উপজেলার ফুলতলা ইউনিয়নের এককালের নাম-ডাকওয়ালা দক্ষিণডিহি গ্রামে জম্মগ্রহণ করেছিলেন। ভৈরব নদের অববাহিকায় শান্ত, ছিমছাম, নিরিবিলি একটি গ্রাম দক্ষিণডিহি। সেখানেই ছিল তার ভিটামাটি। উপযুক্ত বয়স হলে পর দক্ষিণডিহির রায়বাড়ির বেণীমাধব বাবু একদিন বিয়ে করে ঘরে নিয়ে এলেন দাক্ষায়ণী দেবীকে। বিয়ের পর ১৮৭৪ খ্রীঃ মার্চ মাসে তাদের একটি কণ্যা সন্তান হয়। তারা তার নাম রেখেছিলেন ভরতারিণী। কিন্তু গ্রামের আপন মানুষগুলোর কাছে মেয়েটি পদ্ম, ফুলি, ফেলি নামেই অধিক পরিচিত ছিল। এরপর তাদের একটি ছেলে হলে তার নাম রাখা হয় নগেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরী, কিন্তু গ্রামের লোকেরা ডাকতো ফেলুবাবু বলে। টিনের চালওয়ালা একটি বাড়িতেই ছিল তাদের সাদামাটা সংসার।

নৃতত্ব, প্রত্নতত্ব ও ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয়, দক্ষিণডিহি গ্রামটি বেশ প্রাচীন ও সম্মৃদ্ধ এক জনপদের অংশ। সতীশচন্দ্র মিত্র বলছেন, রাজা বল্লাল সেনের (১০৮৩ – ১১৭৯ খ্রীঃ) আমলে কণৌজাগত দক্ষের বংশধর ব্রাহ্মণ একটি পরিবারের দক্ষিণডিহিতে বিশেষ কর্তৃত্ব/প্রভাব ছিল। তাদের পূর্ব পুরুষ জয়কৃষ্ণের দু’পুত্র নাগরনাথ ও দক্ষিণানাথ রাজা গণেশের (১৪১০ – ১৪১৪ খ্রীঃ) সময় স্থানীয় কোনো হিন্দু নরপতিকে যুদ্ধে সাহায্য করার উপহার স্বরূপ রায়চৌধুরী উপাধি পায়। ক্রমে তারা চেঙ্গুটিয়া (যশোর জেলার অভয়নগর উপজেলায় অবস্থিত)সহ আশেপাশের বেশ কিছু জায়গা দখল করে নিজেদের শাসনকার্য চালাতে থাকে। কৌশলগত নানাদিক বিবেচনা করে তারা দক্ষিণডিহির এই স্থানে বসতি স্থাপন করে। কিছুদিন পর দুই ভাইয়ের মধ্যে গন্ডগোল হলে উভয়ই একে অন্যের থেকে আলাদা হয়ে যায়। বড় ভাই নাগরনাথ রায়চৌধুরী ভৈরব নদের উত্তরে স্থান নেন তাই সেই এলাকার নাম হয় উত্তরডিহি আর ছোট ভাই দক্ষিণানাথ রায়চৌধুরী দক্ষিণে রয়ে যান বলে নাম হয় দক্ষিণডিহি।

খান জাহান আলী (১৩৬৯ – ১৪৫৯ খ্রীঃ) ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বারবাজার থেকে, যশোরের মুড়লী হয়ে খুলনার ফুলতলার পয়োগ্রাম ভেদ করে যে ১১২ কিলোমিটার রাস্তা তৈরী করেন তার পাশে ৪টি কসবা/শহরও প্রতিষ্ঠা করেন। এই ৪টি কসবা/নগরের একটি হল পয়োগ্রাম। খান জাহান আলীর রাস্তাটি পয়োগ্রাম নগরকে দু’ভাগে ভাগ করার কারনে দক্ষিণের অংশের নাম হয় দক্ষিণডিহি আর উত্তরের অংশের নাম হয় উত্তরডিহি – সতীশ বাবু এমন তথ্যও উপস্থাপন করেছেন।

যাহোক, খান জাহান আলীর আগমনের পর উত্তরডিহির নাম হল খাঞ্জেপুর, সেখানে তিনি নিজ আবাস, মসজিদ, দিঘী ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করে সদ্য প্রতিষ্ঠিত নগরের কার্যক্রম আরম্ভ করেন। আগেই বলেছি, গ্রামে তখনও রায়চৌধুরী পরিবারের খ্যাতি ও প্রভাব দু’ই সমানতালে বজায় ছিল। খান জাহান আলী বিচক্ষন শাসক, তিনি দক্ষিণানাথ রায়চৌধুরীর ৪ ছেলের মধ্যে প্রথম দু’জন কামদেব রায়চৌধুরী ও জয়দেব রায়চৌধুরী-কে তার সভাসদে গুরুত্বপূর্ন পদে নিয়োগ দেন। দক্ষিণানাথ রায়চৌধুরীর অপর দু’জন ছেলে হলেন রতিদেব রায়চৌধুরী ও শুকদেব রায়চৌধুরী।

খান জাহান আলী যখন বারবাজার ত্যাগ করে বাগেরহাট অভিমুখে অভিযানে রওনা হন তখন তিনি একজন ব্রাহ্মণকে পথ প্রদর্শক হিসাবে পান। উক্ত ব্রাহ্মণ পরবর্তীতে খান জাহান আলীর পয়োগ্রাম/দক্ষিণডিহি কসবা/নগরের উজির পদ লাভ করে। উজির মহাশয় ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে মুহাম্মদ তাহের নাম গ্রহণ করে (অনেকে বলেন তার আগের নাম গোবিন্দলাল রায়)। খান জাহান আলী দক্ষিণডিহি থেকে বাগেরহাটে গমন করলে পর উজির মুহাম্মদ তাহের-ই হন এখানকার শাসক। তিনি হিন্দু, বৌদ্ধ সকলকে নির্বিশেষে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ/দীক্ষা দিতে থাকেন। এভাবে যারা ইসলাম ধর্ম গ্রহন করে প্রকৃত মুসলমান হলেন তারা ‘পীর আলি মুসলমান’ আর যারা মুসলমানের সাথে মিশে সমাজচ্যুত হলেন তাদের কেউ হলেন পীর আলি ব্রাহ্মণ, কেউ বা পীর আলি কায়স্থ ইত্যাদি। আর সেই থেকে এদেশে ‘পীর আলি’ বা ‘পীরালি’ সম্প্রদায়ের উৎপত্তি হয়। কথিত আছে, রামদেব ও জয়দেব উজির মুহাম্মদ তাহেরের সভাসদ হবার পর তাহের সুকৌশলে দু’ভাইকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য করে। অতপর তাহের তাদেরকে কামাল উদ্দীন ও জামাল উদ্দীন খাঁ চৌধুরী উপাধি প্রদান করে। এভাবে পয়োগ্রাম তথা দক্ষিণডিহিতে রায়চৌধুরী পরিবারের মধ্য দিয়ে পীরালি সম্প্রদায়ের যাত্রা শুরু হয়।

ঐ দিকে, খুলনার আরেকটি উপজেলা রূপসা’র পিঠাভোগ গ্রামে বাস করতেন কুশারী পরিবার। এই বংশের রামগোপালের বড় ছেলে জগন্নাথ কুশারীর সাথে দক্ষিণডিহি গ্রামের দক্ষিণানাথ রায়চৌধুরীর ৪র্থ পুত্র শুকদেব রায়চৌধুরীর কণ্যা সুন্দরী দেবীর বিয়ে হয়। বিয়ের পর নব-দম্পতি দক্ষিণডিহি গ্রামেই তাদের সংসার শুরু করেন। জগন্নাথ কুশারীর দ্বিতীয় পুত্র পুরুষোত্তম, মেজো ছেলে মহেশ্বর কুশারী’র ছেলে পঞ্চানন কুশারী ও তাদের কাকা শুকদেব কুশারীকে সাথে নিয়ে ব্যবসার সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে কলকাতার গোবিন্দপুর যান। ইউরোপীয়ান জাহাজের সাথে কারবার খুলে পঞ্চানন বাবু কিছু অর্থ উপার্জন করে সেখানেই একটি বাড়ি তৈরী করে বসবাস করতে থাকেন। অল্প দিনেই তিনি বাড়িতে একটি শিব মন্দিরও প্রতিষ্ঠা করেন। তার প্রতিবেশীরা কম-বেশী সবাই ছিলেন ধীবর। মন্দির প্রতিষ্ঠা করার কারণে পঞ্চানন বাবু এই সব তথাকথিত অতি সাধারন কৈবর্ত/জেলে মানুষগুলোর কাছে ঠাকুর বলে অভিহিত হতে থাকেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, তারা গোবিন্দপুরের যে হরিজন পল্লীতে প্রথম বসতি স্থাপন করেন সেখানে কোনো ব্রাহ্মণ না থাকায় তাদের মাঝে ব্রাহ্মণ পেয়ে সবাই তাদেরকে ঠাকুর বলে ডাকতে থাকে। যাহোক পঞ্চানন কুশারী কালে সবার কাছে হয়ে ওঠেন পঞ্চানন ঠাকুর।

পঞ্চানন ঠাকুরের পুত্র জয়রাম ঠাকুরের ছেলে নীলমনি ঠাকুর ১৭৮৪ খ্রীঃ কলকাতার জোড়াসাঁকোয় বাড়ি নির্মাণ করেন। নীলমনি ঠাকুরের পৌত্র দ্বারকানাথ ঠাকুর বৃটিশ বেনিয়াদের সাথে জাহাজের ব্যবসা পেতে অর্থ-সম্পদ যেমন পেয়েছেন তেমনি অর্জন করেছিলেন প্রভাব-প্রতিপত্তি। যৌবনে তিনি রেশম, নীল ক্রয়/সরবরাহ করা দিয়ে ব্যবসা শুরু করে পর্যায়ক্রমে লবন, কয়লার খনি ও চিনির কারখানা ইজারা নেওয়া, ঠাকুর কোম্পানী এমনকি ব্যাংক স্থাপন ও বাংলা ও বাংলার বাইরে জমিদারী কিনে বিশাল সম্পদ আর সম্পত্তির অধিকারী হন। দু’দফা বিলেত ভ্রমণ করে ও সেখানে দেদারছে খরচপাতি করার কারণে তার ‘প্রিন্স’ খেতাব জুটে এবং সেই থেকেই সবাই তাকে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর হিসাবেই চিনেন। মূলতঃ তার হাতেই জোড়াসাঁকোর ঠাকুর এস্টেট প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর বিয়ে করেন দিগম্বরী দেবীকে। দ্বারকানাথের পুত্র দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বিয়ে করেন সারদা সুন্দরী দেবীকে। দ্বারকানাথ ও দেবেন্দ্রনাথ উভয়ের শশুরবাড়িই দক্ষিণডিহি গ্রামে। রবীন্দ্রনাথ দেবেন্দ্রনাথের ১৫ জন সন্তানের মধ্যে ১৪ তম ও কুশারী বংশের রামগোপাল বংশধারার ১৩ তম পুরুষ।

*




0 Comments 125 Views
Comment

© FriendsDiary.NeT 2009- 2019