FriendsDiary.NeT | Friends| Inbox | Chat
Home»Archive»

দূর্গাসাগর – বরিশাল

দূর্গাসাগর – বরিশাল

*

প্রাগৈতিহাসিক যুগের দোয়াঁশ মাটির ভূমি দ্বারা গঠিত বরিশাল বাংলাদেশের একটি অতি প্রাচীন স্থান। সে সময় গঙ্গার মোহনায় মোদকলিঙ্গ নামের যে দ্বীপ ছিল পন্ডিতরা মনে করেন বরিশালের আদি নামের অস্তিত্ব এই মোদকলিঙ্গ দ্বীপ-এর মধ্যে নিহিত। বর্তমানে গৌরনদী উপজেলার মেদাকুল গ্রাম আর মোদকলিঙ্গ দ্বীপ অভিন্ন – এমনটাই ধারনা বিশেষজ্ঞদের। আামরা দেখা পাই, ৩২৬ খ্রীঃপূঃ ম্যাসিডনের আর্গিয়াদ রাজবংশের ৩য় আলেকজান্ডার যখন ভারত অভিযান করেন তখনও বরিশাল একটি জনপদ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত। অন্যদিকে, মিশরের টলেমেইস হারমিওউ শহরে জম্মগ্রহণকারী বিখ্যাত গ্রীক ভূগোলবিদ, জ্যোতির্বিদ, গণিতজ্ঞ ও জ্যোতিষি ক্লডিয়াস টলেমিয়াস (টলেমি নামেই যিনি অধিক পরিচিত) প্রণীত ১৫০ খ্রীঃ মানচিত্রেও এ অঞ্চলের ভূভাগ নির্দেশিত হতে দেখা যায়। আবার বঙ্গের সেন বংশের দ্বিতীয় রাজা বল্লাল সেনের (১১৫৮ খ্রীঃ – ১১৭৯ খ্রীঃ) উত্তরসূরী রামনাথ দে যিনি দনুজমর্দন উপাধি ধারন করে দনুজমর্দন দেব (রাজত্বকাল ১৩৪২ খ্রীঃ – ১৩৩৯ খ্রীঃ) নামে আমাদের সকলের কাছে অতি পরিচিত তিনি তার গুরু চন্দ্রশেখর চক্রবর্তীর নামে মোদকলিঙ্গ দ্বীপের নাম ‘চন্দ্রদ্বীপ’ রাখেন – আমাদের ইতিহাসে এমন অসমর্থিত সূত্রের সমার্থন রয়েছে।


দূর্গাসাগর দিঘী
সেই সময়, উত্তরে ঢাকা জেলার ইছামতি নদী, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে মেঘনা নদীসহ খুলনা, সন্দীপ, নোয়াখালী, হাতিয়া, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, কোটালীপাড়া, বাগেরহাট ইত্যাদি বিস্তৃত অঞ্চল/ভূভাগ চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত হয়। চন্দ্রদ্বীপের প্রথম রাজধানী গোবিন্দপুর (বাকেরগঞ্জ) সোনারগাঁওয়ের সুলতানদের চাপে পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার কচুয়া নামক স্থানে স্থানান্তরিত হয়। নতুন এই রাজধানীর নাম রাখা হয় বাঙ্গালা। ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয়, বিখ্যাত এক ‘বাঙ্গালা’র কথা যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র ও বন্দর হিসাবে সর্বমহলে স্বীকৃতি পেয়েছিল। মনে করা হয়, বাঙ্গালা আর বাকলা অভিন্ন। বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চল ‘বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ’ নামেও বিশেষ করে মোঘলামলে পরিচিত ছিল যা আইন-ই-আকবরী গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। আরবী বাকলা শব্দের অর্থ শষ্য ব্যবসায়ী – হতে পারে আরব বনিকদের দ্বারা বাঙ্গালা বাকলা নাম ধারন করে। যাহোক, সেন বংশীয় মহান এই রাজা দনুজমর্দন দেব খ্রীঃ ১৪ শতকে চন্দ্রদ্বীপ নামের এক স্বাধীন রাজ্য ও রাজবংশের সূচনা করেন। ইতিহাসে সুবিখ্যাত এই রাজা, তার নিজ রাজ্যের নের্তৃত্বের পাশাপাশি কুলীন কায়স্থগণের ‘বাকলা সমাজ’ প্রতিষ্ঠা করেন ও এই সমাজের গোষ্ঠীপতি নির্বাচিত হন।


বুয়েটের সতীর্থদের সাথে – ১৯৯৮ খ্রীঃ
চন্দ্রদ্বীপ রাজবংশের ৯ম উত্তরসূরী এবং বাংলার বার ভূঁইয়ার অন্যতম রাজা কন্দর্পনারায়ন বসু (১৫৮৪ খ্রীঃ – ১৫৯৮ খ্রীঃ) পর্তুগীজ আর মগ দস্যুদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে কিংবা তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙ্গনের কারণে এবং জলোচ্ছ্বাসে পিতা জগদানন্দের মৃত্যূ ইত্যাদি কারণে চন্দ্রদ্বীপের রাজধানী ৩য় ও এই রাজবংশের রাজত্ব্যের সময় শেষবারের মতো বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশায় স্থানান্তর করে নতুন রাজধানীর নাম রাখেন ‘শ্রীনগর’। তিনি তার ১৪/১৫ বছরের রাজত্বকালে নতুন এই রাজধানীতে তৈরী করেন রাজবাড়ি আর রাজবাড়িকে ঘিরে মন্দির, দিঘী ও অন্যান্য স্থাপনা। কালের গর্ভে সে সবই আজ অস্তিত্বহীন। তবুও কালের স্বাক্ষী হয়ে এখনও রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ ও কিছু কিছু দিঘী কোনো ভাবে টিকে আছে।

এই রাজ বংশের ১৫তম উত্তর-পুরুষ শিব নারায়ণ মিত্র (১৭৬৯ খ্রীঃ – ১৭৭৭ খ্রীঃ)। শিব নারায়ণের মহিয়ষী দূর্গাবতী (মৃত্যু – ১৮১৩ খ্রীঃ)। দূর্গাবতীর স্বামী জমিদার শিব নারায়ণ মানসিক প্রতিবন্ধী ছিলেন এবং তার অকাল মৃত্যু হলে তাদের ছেলে লক্ষীনারায়ণ রাজা হন। লক্ষীনারায়ণেরও যখন অকাল মৃত্যু হয় তখন রাজ্য পরিচালনার ভার অর্পিত হয় রাণী দূর্গাবতীর উপর। এই সময় রাণী দূর্গাবতী গর্ভবতী ছিলেন এবং অল্পকাল পরেই জয়নারায়ণ নামে এক পুত্র সন্তানের জম্ম দেন। রাজা জয়নারায়ণ (১৭৭৮ খ্রীঃ – ১৮১৩ খ্রীঃ) নাবালক থাকায় রাণী দূর্গাবতীই কার্যত রাজ্য পরিচালনা করতে থাকেন। এই সময় অর্থাৎ নবাবী আমলে চন্দ্রদ্বীপের নাম মুঘল ‘আগা বাকেরের’ নামে ‘বাকেরগঞ্জ’ ও পরে বৃটিশ দখলদ্বারিত্বের সময় প্রধান লবন কারবারের কারণে ‘বরি-সল্ট’ হতে ‘বরিশাল’ নামকরণ করা হয়।


দূর্গাসাগর দিঘী – পশ্চিম ঘাট ও মাঝখানের দ্বীপের এখনকার হাল
বরিশাল থেকে বানরীপাড়া – স্বরূপকাঠি রাস্তা ধরে এগোলে মাধাবপাশা গ্রাম – গ্রামের পশ্চিমে শ্রীপুর, পূর্বে কলাডেমা, উত্তরে পাংশা আর দক্ষিণে শোলনা ও ফুলতলা গ্রাম। জনশ্রূতি বলে, রাজা শিব নারায়ণ প্রজা সাধারনের জল কষ্ট নিবারনের জন্য এই গ্রামগুলোর মধ্যখানে একটি দিঘী খনন করেন। আবার অনেকের মত হলো, রাজা রাণীর সন্তুষ্টি কিংবা প্রেমের নিদর্শনস্বরূপ দিঘী খননের সিদ্ধান্ত নেন। সে মোতাবেক, রাজা রাণীকে পিছনে না ফিরে এক রাতে/সকাল-সন্ধ্যা যতদূর হেঁটে যেতে পারবেন সেই পরিমান জায়গা জুড়ে দিঘী কাটা হবে বলে প্রতিশ্রূতবদ্ধ হন। কথা মতো রাণী হাঁটছেন তো হাঁটছেনই, থামার নাম নেই, হঠাৎ রাণী পিছন থেকে ঘোড়ার ডাক/রাজ কর্মচারীদের ঢাকের আওয়াজ শুনতে পেলেন – থামলেন তিনি। কিন্তু ততক্ষনে রাণী ৬১ কানি পরিমান জায়গা হেঁটে ফেলেছেন। প্রতিশ্রূতি অনুযায়ী রাজার ইচ্ছা আর চারিদিকের গ্রামের হাজার হাজার মানুষের স্বেচ্ছাশ্রমের বিনিময়ে দিঘী ১৭৮০ খ্রীঃ/১১৮৭ বঙ্গাব্দে খনন করা হয়।


দূর্গাসাগর দিঘী – পশ্চিম ঘাট ও মাঝখানের দ্বীপ – বুয়েটের সতীর্থদের সাথে ১৯৯৮ খ্রীঃ
প্রায় ৬ মাস ধরে ৩ লাখ টাকা ব্যায় করে দিঘী খনন করা হলো। স্বেচ্ছাশ্রমের পাশাপাশি খনন শ্রমিকদেরকে মুজুরী হিসাবে কড়ি প্রদান করা হয়। জনশ্রূতি আরো বলে, দিঘীতে পানি না ওঠার কারণে রাণীকে দিঘীর জলে আত্মাহুতি দিতে হয়েছিল। আত্মহুতির কালে রাণীর কোলে যে শিশু পুত্র ছিল রাজা তাকে নিয়ে বিপাকে পড়েন। কে দেখবে, কে দুধ দিবে, কে দিবে এই শিশুর মায়ের স্নেহ-মমতা-আদর! কিন্তু সমস্যার খানিকটা লাঘোব হলো যখন দাইমা শিশুটিকে নিয়ে দিঘীর পাড়ে বেড়াতে আসতেন তখন জলের ভিতর থেকে রাণী উঠে এসে কৌশলে তার সন্তানকে প্রতিদিন দুধ পান করাতেন এবং সকলের অগোচরে আবার উধাও হয়ে যেতেন। বিষয়টি প্রথমে দাইমা ও পরে রাজার নজরে এলে পর রাজা একদিন চালাকি করে রাণী যখন বাচ্চাকে দুধ পান করাচ্ছিলেন তখন দেখে ফেলেন বা দেখার জন্য জোর-জবরদস্তি করেন। সেই থেকে রাণী আর জল থেকে উঠেন নাই। যাহোক, রাণীর নামে দিঘীর নাম হয় ‘দূর্গাসাগর’ তবে কেউ কেউ ‘মাধবপাশা দিঘী’ বলেও জানেন।

*




0 Comments 173 Views
Comment

© FriendsDiary.NeT 2009- 2019