FriendsDiary.NeT | Friends| Inbox | Chat
Home»Archive»

লাভ ম্যারেজ বনাম এ্যারেঞ্জ ম্যারেজ

লাভ ম্যারেজ বনাম এ্যারেঞ্জ ম্যারেজ

*

লাভ ম্যারেজ আর অ্যারেঞ্জড ম্যারেজের মধ্যে যেটি ‘অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ’ নামে পরিচিত, সেটিকেই প্রায় সকল ধর্ম অনুমোদন দেয়। অপরটিকে ছিঃছিঃ করে। এ নিয়ে বিশ্বাসীদের মনেও কিছু প্রশ্নের উদয় হওয়া স্বাভাবিক। মনে প্রশ্ন আসা মানেই বিশ্বাস থেকে ছিটকে পড়া নয়। অবিশ্বাসীদের প্রশ্ন তো আছেই। সঠিক ও ত্রুটিহীন জ্ঞান কেবল আল্লাহর নিকট সংরক্ষিত। আমরা শুধু আল্লাহর হুকুমের পেছনের হিকমাহ অনুসন্ধান করতে পারি। অনুসন্ধানে কোনো ফলাফল আসুক বা না আসুক, সর্বাবস্থায় সকল প্রশংসা আল্লাহর।

বস্তুবাদী-অবস্তুবাদী নির্বিশেষে আমরা সবাই একমত যে, মানুষ আর মেশিন আলাদা জিনিস। মেশিনে কী ইনপুট দিলে কী আউটপুট আসবে, তা প্রায় নির্ধারিত। যেমন, কোনো মেশিনের অফ-অন বাটন। ইনপুট-আউটপুটের সেটও সসীম। যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য যন্ত্র উলটাপালটা আচরণ শুরু করলেও সেই উলটাপালটা আচরণের সেটও সসীম। মানুষের (বা জীবের) ইনপুট-আউটপুট সিস্টেম এরকম নয়। কাতুকুতু দিলে সবাই হাসে না। হাসলেও একই মাত্রায় হাসে না। মানুষের ইনপুট-আউটপুটের বিন্যাস-সমাবেশ অসীম। আল্লাহর কাছে অসীম নয়, মানুষের জ্ঞানের পরিধির তুলনায় অসীম। যেমন- চাল বা ডালের দানা গণনাযোগ্য হলেও সেগুলো uncountable noun এর মধ্যে পড়ে। লাভ ম্যারেজ বনাম অ্যারেঞ্জড ম্যারেজের আলোচনায় সর্বপ্রথম আমাদের মানুষের এই অসীমতাকে স্বীকার করতে হবে। তারপর পরবর্তী আলোচনায় এগোতে হবে।

একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে পছন্দ বা অপছন্দ করার স্বরূপ কী? আমরা কখনওই কারো অসীম সংখ্যক আচার-আচরণ বিবেচনায় এনে পছন্দ-অপছন্দ নির্ধারণ করি না। এই অসীম সংখ্যক আচরণের মধ্যে অল্প কিছু ক্রাইটেরিয়া দেখেই আমরা প্রাথমিক সিদ্ধান্তে আসি। বেশি গুরুত্বপূর্ণ ক্রাইটেরিয়া যদি পূরণ হয়ে যায়, তাহলে কম গুরুত্বপূর্ণ ক্রাইটেরিয়ার অভাবকে আমরা উপেক্ষা করতে পারি (অথবা না-ও করতে পারি)। এভাবে ক্রাইটেরিয়াগুলো গুরুত্ব বিবেচনায় পিরামিডের মতো সরু হতে থাকে। মানুষের অসীম সংখ্যক স্বভাব-বৈশিষ্ট্যের সমস্যার সমাধান মানুষ এভাবেই করে।

হাতিব বিন বালতাহা (রাঃ) একজন সাহাবি। একদম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্রাইটেরিওন পূরণ হয়ে গেছে। তাই আমরা মুসলিমরা তাঁকে ভালোবাসি। তিনি বদর যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। ভালোবাসা আরো বাড়লো। মক্কা অভিযানের আগে দিয়ে তিনি একটি ভুল পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছিলেন, যা আগেই থামানো না গেলে মুসলিমদের বড় বিপদ হয়ে যেত। কিন্তু এ কারণে তাঁর প্রতি আমাদের ভালোবাসা পাল্টে যায়নি। মুসলিমদের ভালোবাসার বুনিয়াদি শর্তগুলো আগেই পূরণ হয়ে যাওয়ায় তাঁর ওই একটি ভুল পদক্ষেপের উদ্যোগকে আমরা একপাশে সরিয়ে রাখতে পারছি। এভাবেই মানুষ মানুষের সাথে কম্প্রোমাইজ করে নিয়ে সামাজিক ও দলবদ্ধ জীবনযাপন করে। উল্টোভাবে, বুদ্ধিজীবী আবু জাহলকে আমরা ঘৃণা করি তার কুফরের কারণে। মুসলিমদের ভালোবাসার একদম বুনিয়াদি শর্তটিই সে পূরণ করেনি, তাই তার অন্য কোনো বৈশিষ্ট্য আমরা আর বিবেচনায় নিই না।

আবার ধরুন আপনার অফিসে এমন একটা পদে লোক লাগবে, যেই পদে বিশ্বস্ততা একদম অবশ্য পূরণীয় শর্ত। সে পদে কর্মচারী নিয়োগ দেবার সময় যদি বিশ্বস্ত কাউকে পেয়ে যান, তাহলে তার অতিরিক্ত কফি পানের বদভ্যাসকে আপনি হয়তো উপেক্ষা করবেন। কারণ বুনিয়াদি শর্ত পূরণ হয়ে গেছে। পরিমিত কফি পান করে কিন্তু অবিশ্বস্ত, এমন আবেদনকারীর চেয়ে সে অবশ্যই বেশি উপযুক্ত।

জীবনসঙ্গী (শব্দটা একটু সমস্যাযুক্ত, কিন্তু ‘যৌনসঙ্গী’ বললে আবার অর্থ অনেক বেশি সংকীর্ণ হয়ে যায়) নির্ধারণের ক্ষেত্রেও মানুষের কিছু ক্রাইটেরিয়া থাকে। কিছু ফার্স্ট প্রায়োরিটি, কিছু সেকেন্ড প্রায়োরিটি, কিছু থার্ড…ইত্যাদি। এগুলো একেকজনের কাছে একেকরকম হতে পারে। তবে কমন কিছু বৈশিষ্ট্য হলো দৈহিক সৌন্দর্য, সুস্থতা, চরিত্র, আচরণ, সম্পদ, বংশ ইত্যাদি। কারো কাছে হয়তো সৌন্দর্য আর চরিত্র ফার্স্ট প্রায়োরিটি। পছন্দমতো একজন সঙ্গী পেয়ে গেলে সে জীবনসঙ্গীর সম্পদের স্বল্পতার সাথে একরকম মানিয়ে নেবে। ইত্যাদি।

কিন্তু একদম সব ক্রাইটেরিয়া পূরণ করে এমন জীবনসঙ্গীর সাথে পথচলা শুরু করার পরও এমন কিছু আবিষ্কার হতে পারে, যা একজনেরটা আরেকজনের কাছে পছন্দ হচ্ছে না। কেউ হয়তো তর্ক শুরু করলে নিজের মতটা একদম চাপিয়ে দিয়ে তবেই ক্ষান্ত হয়। কেউ হয়তো বেশি রাত জাগে। কেউ জোরে ঢেকুর তোলে। কেউ বিছানার নিচ থেকে কিছু বের করার পর বিছানার চাদরটা আবার সোজা না করেই চলে যায়। এরকম লক্ষ-কোটি বিষয় আছে, যা একজন মানুষ আরেকজনের ক্ষেত্রে পছন্দ করে না। মোটামুটি ঘনিষ্ঠভাবে মিশেছেন, এমন একজন মানুষের কথা চিন্তা করে দেখুন, যার অন্তত একটা না একটা দিক আপনার কাছে বিরক্ত লাগে না। পাবেন না। পরিবারের সদস্য, সহকর্মী, সহপাঠী, রুমমেট, এলাকার পরিচিত কেউ–সবার ক্ষেত্রেই এ কথা খাটে। এটাই মানুষের বৈশিষ্ট্য।

লাভ ম্যারেজের পক্ষে যারা তর্ক করে, তাদের ধারণা তারা কিছুদিন মেলামেশা করে এই লক্ষ-কোটি আচরণ বৈচিত্র্যের সবকিছু আবিষ্কার করে নিতে পারবে। এই লক্ষ-কোটি বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে নিয়ে তারপর পছন্দসই কাউকে সঙ্গী বানিয়ে নেবে। এটা সম্ভব নয়, সেই সক্ষমতা দিয়ে মানুষকে সৃষ্টি করা হয়নি। যেসব বৈশিষ্ট্য যাচাই করা সম্ভব, সেগুলো অ্যারেঞ্জড ম্যারেজেও যাচাই করে নেয়া যায়। যেসব বৈশিষ্ট্য আগে যাচাই করা সম্ভব নয়, সেগুলো আট-দশ বছর (ক্লাস এইট থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত) প্রেম করেও বের করা সম্ভব না। কারণ মানুষের আচরণ অসীম সংখ্যক, আবার আমৃত্যু একজন মানুষ পরিবর্তিত হতে থাকে নানাভাবে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে খাদিজা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার বিয়েকে কি আপনি লাভ ম্যারেজ বলবেন, না অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ? খাদিজা (রাঃ) নবীজী (সাঃ)-এর বিশ্বস্ততা ও চারিত্রিক উৎকর্ষের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান (সেইসাথে চেহারার সৌন্দর্যও ভালো লেগে থাকতে পারে, অস্বাভাবিক কিছু না, যদিও সীরাত গ্রন্থগুলোতে এর সরাসরি উল্লেখ আমরা দেখিনি)। এখন এই বিষয়গুলো দেখার জন্য কি খাদিজা (রাঃ)-কে রাসূল (সাঃ)-এর সাথে সেসব কাজ করা লেগেছে, যেসব কাজকে বর্তমানে আমরা ‘প্রেম করা’ বলে জানি? নাকি প্রোফেশনাল মুয়ামালাত করতে করতেই স্বাভাবিকভাবেই বিষয়গুলো যাচাই করে নিয়েছেন? অবশ্যই দ্বিতীয়টি। ‘বিয়ের আগে জেনেশুনে নেয়া’ আর ‘বিয়ের আগে প্রেম করা’ এ দুটো যে আসলে সমার্থক নয়, তা এখান থেকেই বোঝা যায়।

বাস্তবে তাই অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ মানেই ‘কবুল’ বলে অপরিচিত একজন মানুষের সাথে শুয়ে পড়া নয়, যেমনটা শূকর-বাঁদরের বংশধরেরা প্রচার করে থাকে। যেকোনোভাবে পরিচিত বা চোখে পড়া মানুষের কোনো না কোনো দিক ভালো লেগে যাওয়াও ইসলামে হারাম না, সিভি/বায়োডাটা দেখে ভালো লাগাও হারাম না। ক্লোজ আপ কাছে এসো ভার্শনের প্রেম না করেও পারিবারিকভাবে দুজন মানুষ একে অপরের ব্যাপারে এক্সটেনসিভলি খোঁজখবর নিয়ে বিয়ের সিদ্ধান্তে আসতে পারে। এই এক্সটেনসিভ খোঁজখবর নেয়াটাই বরং নিয়ম। এরপরও যতটুকু আগেই জেনে নেয়া একেবারেই সম্ভব না, সেটি লিটনের ফ্ল্যাটে গিয়েও জানা সম্ভব না, সিভি দেখেও সম্ভব না।

ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রেমিক-প্রেমিকাদের মধ্যেও ঘটে, লাভ ম্যারেজেও ঘটে, অ্যারেঞ্জড ম্যারেজেও ঘটে। আদর্শ ইসলামি সমাজে তালাক কোনো ট্যাবুও না, ট্রেন্ডও না। ইসলামের অন্যান্য জায়েয বিধানের মতোই একটি বিধান। এজন্যই আমরা কয়েক অনুচ্ছেদ আগে ‘জীবনসঙ্গী’ কথাটার ব্যবহার নিয়ে কথা তুলেছি। ‘জীবনসঙ্গী’ শব্দটা ইমপ্লাই করে যে, একবার কারো সাথে সংসার পাতলে আমৃত্যু তার সাথে থাকতেই হবে। হ্যাঁ, আমরা চাই মুসলিমদের ঘরগুলো অটুট থাকুক, শয়তান চায় তার উল্টোটা। কিন্তু একেবারেই বনিবনা না হলে অপছন্দের একটা মানুষকে ঘাড়ে নিয়ে জীবন কাটানোটাও ইসলামের বিধান নয়। সমাজের বিধান হতে পারে, ইসলামের না।

ভালোবাসা তৈরি করেই তারপর এক হতে হবে, এক হওয়ার পর ভালোবাসা তৈরি হয় না–এই ধারণাটা অবাস্তব। আপনার মা-বাপকে কি আপনি আট-দশ বছর প্রেম করে বেছে নিয়েছেন? না জন্মের পর দেখেছেন এটা আপনার মা, ওটা বাবা, সেটা ভাই-বোন? কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বেশিরভাগ মানুষই মোটাদাগে তার পরিবারকে, পরিবারের সদস্যদের, আত্মীয়দের ভালোবাসে। পরিবার, সতীর্থ, সহকর্মীদের প্রতি যে ধরনের ভালোবাসা মানুষ দেখায়, তার বেশিরভাগই একসাথে থাকতে থাকতে তৈরি হওয়া ভালোবাসা। ভালোবেসে তারপর এক হওয়া না।

যদিও নাস্তিক মানেই প্রেম করে, মুসলিম মানেই বিয়ে করে–এমন কোনো কথা নেই। তারপরও বিয়ে নামক ধর্মীয় ইন্সটিটিউশানের বিরুদ্ধে বর্তমান নিরীশ্বরবাদী সেকুলাঙ্গার জীবনদর্শনের প্রধান কাউন্টার হলো বিয়েবহির্ভূত প্রেম। এই জীবনদর্শনে তাকদীরের কোনো ধারণা নেই, দুনিয়ার অপ্রাপ্তি আখিরাতে পূরণের ধারণা নেই। তাই এই দর্শন মেনে পার্ফেক্ট জীবনসঙ্গী/যৌনসঙ্গী পেতে হলে পৃথিবীর ৭ বিলিয়ন মানুষকেই আট-দশ বছর ধরে চেখে দেখতে হবে (অথবা অন্যান্য জীবকেও)। কিন্তু সে পরিমাণ সময় একটা মানুষ বাঁচে না, বিজ্ঞান এখনও অত উন্নত হয়নি। বারবার স্বাদবদলের এই অবাধ ব্যক্তিস্বাধীনতায় সোশ্যাল স্টেবিলিটিও ঠিক থাকে না। ধর্ম কি তাহলে পার্ফেক্ট জীবনসঙ্গীর নিশ্চয়তা দিচ্ছে? অবশ্যই না। ধর্ম আমাদের তাকদীরের ভালো ও মন্দের ব্যাপারে সন্তুষ্ট থাকতে হুকুম করে। আখিরাতের জন্য দুনিয়ার কষ্ট মানতে বলে। পার্ফেক্ট জীবনসঙ্গী এখানে কোনো আলোচ্যই না। অ্যাবসোলিউট পার্ফেকশান আল-খালিকের বৈশিষ্ট্য, মাখলুকের বৈশিষ্ট্য না।

তাহলে সার্বিক বিবেচনায় দেখা যাচ্ছে কোনো ক্ষেত্রেই প্রচলিত অর্থে লাভ ম্যারেজ, প্রচলিত অর্থে অ্যারেঞ্জড ম্যারেজের তুলনায় উত্তম ফলাফলের নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। এই লেখায় যা আলোচিত হলো, তার মাঝে যা কিছু কল্যাণকর তা আল্লাহর পক্ষ থেকে। যা কিছু ভুল ও অকল্যাণকর, তা শয়তানের প্ররোচণায় লেখকের ভুল।

*




0 Comments 261 Views
Comment

© FriendsDiary.NeT 2009- 2019