FriendsDiary.NeT | Friends| Inbox | Chat
Home»Archive»

প্রকৃতির প্রতিদান

প্রকৃতির প্রতিদান

*

বিয়ের পনেরোত্তর বছর পর যখন অক্ষয় ও করুণা দম্পতির ঘর আলো ক’রে প্রথম ছেলের আবির্ভাব হ’লো তখন তারা বংশরক্ষা ও স্বপ্নরক্ষার আনন্দে ঈশ্বরাভিমূখে বার বার প্রাণ সমর্পন ক’রলো। অতপর দ্বিতীয় বছরান্তে দ্বিতীয় সন্তানের আবির্ভাবে যেন তাদের এতোদিনকার সন্তানহীনতার অনুভূতি যেন একেবারেই মুছে গেল। দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে আরা তাদের বন্ধাত্ব কাটিয়ে পূর্ণোদ্দমে নব দম্পতির মতো সংসারবৎসল হ’য়ে সংসারপাত ক’রতে লাগলো। এতদিন পরে পর পর দুই সন্তানের আগমনকে তারা ঈশ্বরের আশীর্বাদ হিসাবেই গ্রহন ক’রলো। প্রতিবেশীদের মধ্য দিয়েও সান্ত্বনাবাক্য এলো যে এতোদিনে তাদের সংসারে সুখ ফিরে এল।

প্রকৃতির রহস্য বড়ই খামখেয়ালীপূর্ণ এবং মানুষ তার হাতে এতই অসহায় যে, মাঝে মাঝে কিছুই করার থাকে না ভাগ্যকে দোষ দেয়া ছাড়া। ঈশ্বরের এমনি কোনো আশীর্বাদে করুণা কে সাদা শাড়ীর বাঁধনে আবদ্ধ হ’তে হ’লো। স্বসন্তানস্ত্রীকে সংসার সুখে ঘুম পাড়িয়ে রেখে স্বামী চ’লে গেলেন অনন্ত জাগরণে। ঈশ্বরভক্তির সন্তুষ্টি সান্ত্বনায় সন্তুষ্ট হ’য়ে সকলই ভাগ্য ব’লে মেনে নিয়ে এবং স্বমীর দায়ভার নিজের উপর টেনে নিয়ে মা সন্তানদের পিতৃ-মাতৃস্নেহে বড় ক’রতে লাগলো।

দিন যায় আর সেই সাথে সোনা-মানিকেরাও বড় হতে থাকে। বড় ছেলে এখন স্কুলে যায়। মা তাকে প্রতিদিন স্নান ক’রিয়ে, নিজের হাতে চুল আচড়িয়ে, ভাত খাইয়ে তার কলিজার টুকরা, তার স্বপ্নকে স্কুলে পাঠায়। ভালোবাসা যেখানে যত গভীর আসংকাও সেখানে তত গভীর। তাই সন্তানের সংকটাশংকায় শঙ্কিত হ’য়ে মা পথের পানে চেয়ে থাকে কখন তার খোকা ফিরে আসবে! কখন সে তার খোকার কপালে মাতৃস্নেহের আল্পনা এঁকে দেবে! যখন তার সোনা রাস্তার মাথায় এসে মা মা ব’লে ডেকে ওঠে তখনই যেন তার সকল অপেক্ষার অবসান ঘটে। দৌড়ে গিয়ে তার প্রাণকে বুকের ভিতর গেঁথে নিয়ে অন্তরের সাধ মেটায়। সাধ হয় তাকে কখনো কোলছাড়া না করে। কিন্তু সভ্যতার আলো দেখবার জন্য তাকে প্রতিদিন মায়ের কোল ছেড়ে স্কুলে যেতে হয়। মা তার কোল পেতে ব’সে থাকে আর ঈশ্বরের নাম স্মরণ ক’রতে থাকে যেন তার আশীর্বাদ সে দেখেশুনে রাখে। যখন সন্তান ফিরে এসে তার শুণ্য বুক ভ’রে দেয় কখনই তার খুশির সীমা ধরে না।

একদিন স্কুলের সময় মাড়িয়ে যায় কিন্তু ছেলে ফেরে না। মায়ের মন আসংকায় পূর্ণ। শুধুই পথের পানে চেয়ে থাকে আর যাকে ও পথ ধরে আসতে দেখে তাকেই জিজ্ঞাসা ক’রে তার সোনাকে দেখেছে কিনা। কেউই বলে না তার সন্তানের খবর। মা ভাবে হয়তে স্কুলে আজ বেশি ক্লাস হ’চ্ছে তাই দেরি হ’চ্ছে। তাছাড়া সন্তান আমার ঈশ্বরের আশীর্বাদ তার কিছু হবে না। কিন্তু কিছুতেই মন বুঝ মানে না। মনটা খুব ছটফট ক’রতে থাকে।

অবশেষে পথের বাকে তার সন্তানকে দেখা যায় তার জেঠিমা’র কোল আলো করে প্রতিদিনের মতো বাড়ি ফিরছে। কিন্তু আজ সে হাসতে হাসতে মা মা বলতে বলতে তার মায়ের কোলে ঝাপিয়ে প’ড়লো না। আজ সে যে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। শংকিত মা ভাবলো হয়তো এত দেরীর জন্য সে ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত হ’য়ে জেঠিমা’র কোলেই ঘুমিয়ে প’ড়েছে। মা তখন দিদির কোল থেকে সন্তানকে নিতে গিয়ে হঠাৎ যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ঠ হ’য়ে স’রে এলো। এ যেন তার সন্তান নয়। যাকে সে প্রতিদিন নিজের হাতে সাজিয়ে গুছিয়ে স্কুলে পাঠাতো; সারাদিন যে মা মা ব’লে যে তার পনেরো বছরের মাতৃত্বহীনতার খেদ নিমিশেই মিটিয়ে দিতো সে আজ অষাঢ়, নির্জীব, শান্ত! যেন মাকে চেনেই না। আজ সে তার জেঠিমা’র কোলেই শান্ত। তার যে আর মায়ের প্রয়োজনই নাই।

[Collected]

*




0 Comments 105 Views
Comment

© FriendsDiary.NeT 2009- 2019