FriendsDiary.NeT | Friends| Inbox | Chat
Home»Archive»

চিঠি পর্ব:-০১

চিঠি পর্ব:-০১

*

__________পর্ব:-০১__________

লেখক: ShoheL Rana

প্রিয় আকাশ,
এখনও আকাশ বলে ডাকছি বলে কি অবাক হচ্ছো? নাকি রাগ হচ্ছে? অথবা ঘৃণা? রাগ বা ঘৃণা করতেই পারো তুমি। তবুও আমি তোমাকে আকাশই ডাকবো। আকাশের মতো বিশাল হৃদয় দেখে একদিন তোমার প্রেমে পড়েছিলাম। ভালোবেসে তোমার নাম দিলাম আকাশ। সেই নামের আড়ালে তোমার আসল নামটাই ঢেকে যায়, শাহিন। আমি তোমাকে আকাশ বলেই জানি, আকাশ বলেই মানি, আজীবন তুমি আকাশ নামেই আমার সারা অস্তিত্বে মিশে থাকবে।
জানো, আজ খুব মনে পড়ছে তোমায়। জানি, তোমাকে মনে করার সেই অধিকারটুকু এখন আমার নেই। তবু কী করবো বলো? অবাধ্য মন আমার। তাই আজ লিখতে বসেছি। কতদিন যে লিখবো লিখবো করে অবাধ্য মনটাকে মানিয়েছি, কতো কথা যে আবেগি মনটা ভেবে রেখেছে, লিখতে বসলেই গুলিয়ে যায় সব। জানোই তো, কোনো কাজ আমি ঠিকঠাক করতে পারি না তোমাকে ছাড়া। আচ্ছা, আমি যে তোমাকে লিখছি, তুমি কি তা পড়বে? নাকি পড়ার আগেই আমার লেখাটা ছিড়ে ফেলে দিবে। অনেক কিছু বলার আছে। সব কি পড়ার ধৈর্য আছে তোমার? নাকি ঘেন্না করে পড়বেই না? এখনও এতো ঘৃণা আমার প্রতি?
আচ্ছা, তোমার কি সেই দিনের কথা মনে আছে, যেদিন আমার হাসি দেখে তুমি প্রেমে পড়েছিলে? কী লজ্জা লজ্জা চেহারা নিয়ে তুমি আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলে, তোমার সেই লজ্জামুখটা মনে পড়লে আমি এখনও একা একা হাসি, জানো? লজ্জা লজ্জা ভাব নিয়ে তুমি মনের কথাটি বলে, তারপর কী দৌড়টাই না দিলে। আমার তো হেসে গড়াগড়ি খাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল। একটা ছেলে ভালোবাসার কথা বলতে এতোটা ভয় পায় কী করে? এরপর কলেজে গেলে প্রতিমুহূর্তে তোমাকে খুঁজতাম, তুমি তো ভয়ে সামনেই আসতে না আমার। তবে যখন তোমাকে দেখতে পেতাম, তখন কী যে ভালো লাগতো আমার। আচ্ছা, নতুন নতুন প্রেমে পড়লে বুঝি এরকমই ভালো লাগে? তোমারও কি এরকম অনুভূতি হতো? নাকি শুধু আমার হতো? তখন আমারও লজ্জা লাগতো তোমার সামনে গিয়ে কথা বলতে। এর আগে তোমার সাথে কতো মিশেছি, কতো কথা বলেছি, কিন্তু ঐদিনের পর থেকে তোমাকে অন্য চোখে দেখা শুরু করি। মাঝেমাঝে আড় চোখে তোমাকে দেখতাম। চোখাচোখি হলেই দৃষ্টি নামিয়ে নিতাম কপালের চুল সরানোর ভান করে। তখন তুমিও বুঝে গেছো আমিও তোমাকে পছন্দ করি। আরেকদিন ভয়ে ভয়ে এসে দাঁড়ালে তুমি আমার সামনে। বললে তোমার সাথে একটু হাঁটবো কি না। আমি যে কী খুশি হয়েছিলাম তখন, তা তোমাকে বুঝতে না দিয়ে জিজ্ঞেস করি,
-কোথায় হাঁটবো?'
তুমি তখন নদীর ধারে যাওয়ার কথা বললে। আমিও মাথা নেড়ে সায় দিলাম। নদীর ধারে গিয়ে দুজন বসলাম। আকাশটা সেদিন মেঘলা ছিল। আকাশের বুকে মেঘগুলোকে ভাসতে দেখে কী সুন্দরই না লাগছিল! যেন তোমার বুকে আমি ভাসছি। আমার নামই তো মেঘলা। তোমার নাম যদি আকাশ হতো! একবার নদীর স্বচ্ছ জল আরেকবার আকাশের বুকে মেঘ দেখতে দেখতে হাঁটছিলাম আমি। তুমি জিজ্ঞেস করলে, এমন করছি কেন আমি? তখন 'কিছু না' বলে কথা ঘুরিয়ে নিয়েছিলাম। হঠাৎ তুমি আমার দুহাত ধরে দাঁড়িয়ে পড়লে। জানো সেদিন আমার কীরকম অনুভূতি হয়েছিল? তোমার ছোঁয়াতে যেন যাদু আছে। আমার সারা শরীরে শিহরণ বয়ে যাচ্ছিল। কী যে এক ভালো লাগা, আমি বলে বুঝাতে পারবো না। বারবার মন বলছিল, এভাবে যেন আজীবন ধরে রেখো আমায়। সেদিন আমাকে তুমি প্রপোজ করলে। আমি যে কী খুশি হয়েছি সেদিন, যেন আমার আর কোনো কিছুই চাওয়ার নেই, যেন শুধু একটা তুমি হলেই আমার সকল অপূর্ণ চাহিদা মিটে যাবে। আমি তো লজ্জায় কিছুই বলতে পারছিলাম না, খেয়াল করে দেখলাম, তুমিও লজ্জা পাচ্ছো ভীষণ। আমি কেবল নিচের দিকে তাকিয়ে, কপালের চুল সরিয়ে মাথা নেড়ে সায় দিই। তখন তোমার সাহস বেড়ে যায় হঠাৎ। আমাকে জড়িয়ে ধরলে দুহাতে। আমি কাঁপতে থাকি। ভয়ে না, প্রচণ্ড এক ভালো লাগায় আমি কাঁপতে থাকি। বারবার মনে হচ্ছিল জ্ঞান হারিয়ে তোমার বুকে ঢলে পড়বো। আচ্ছা, আমি সেদিন জ্ঞান হারালে তুমি কী করতে? নদীর জল মাথায় ঢেলে জ্ঞান ফেরাতে বুঝি?
.
.
রিলেশন শুরুর অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই আমাদের বিয়েটা হয়ে যায়। আমাকে ছাড়া নাকি তোমার ভালো লাগতো না, সময় কাটতো না। তাই আমাকে সবসময় পাশে পেতে বিয়ের কাজটা সেরে নিয়েছিলে। কী যে পাগল ছিলে না তুমি! আমার এখনও হাসি পাই মনে পড়লে। বাসর রাতে তোমার সেই বোকা বোকা ভাবটা মনে পড়লে তো আমার আরও বেশি হাসি পাই। কী করবা তুমি বোঝে উঠতে পারছিলে না। আমি ঘোমটার ভেতর থেকে আড়চোখে খেয়াল করি তুমি ঘামছো। নিজেরই তো বউ তোমার, এতো নার্ভাস হওয়ার কী দরকার? তবে আমিও মনে মনে খুব মজা পাচ্ছিলাম তখন। একসময় ইতস্তত করে তুমি আমার বাহুতে হাত রাখলে। আমি তোমার দিকে তাকাতেই বোকার মতো হাসলে। তা দেখে আমি তো নিজের হাসিটাই আটকাতে পারলাম না। 'ফিক' করে হেসে দিলাম। তুমি আরও বেশি বোকা বনে গেলে। কী করবে বুঝতে না পেরে আমার মুখটা চেপে ধরে চারপাশে তাকালে হাসির শব্দ শুনে কেউ আসছে ভেবে। অথচ তুমি নিজেই দরজাটা আটকে দিয়ে এসেছিলে। কাউকে না দেখে কিছুটা স্বস্তি পেলে। আমি তোমার বুকে মাথা রাখলাম, তুমি আলতো স্পর্শে জড়িয়ে ধরলে আমায়। কী যে এক সুখ অনুভব হলো তখন। ইশ! ভাবলে এখনও শিহরণ লাগে শরীরে।
.
.
ভোরের শিশিরের উপর খালি পায়ে হাঁটতে আমার ভালো লাগতো। তাই শীতের সময় খুব ভোরেই ডেকে দিতাম তোমাকে। তুমি প্রথমে উঠতেই চাইতে না। আমিও আর জোর করতাম না। পরে কী মনে করে যেন উঠে বসতে চোখ মুছতে মুছতে। গায়ে কাঁথা মুড়িয়ে নিয়ে একটু রাগীভাব নিয়ে বলতে, 'চলো।' আমি মূর্তির মতো বসে থাকতাম। তখন তুমি মৃদু হেসে আমার হাত ধরে বলতে, 'চলো লক্ষ্মী বউ আমার।' আমি ফিক করে হেসে তোমার গায়ের কাঁথাটা খুলে নিয়ে আমার চাদরে তোমাকে জড়িয়ে নিতাম। এক চাদরে দুজন নিজেদের মুড়িয়ে নিয়ে খালি পায়ে শিশির ভেজা ঘাসের উপর হাঁটতে অনেক ভালো লাগতো। ভেজা শিশির পায়ে লাগতেই দুজনে একসাথে কেঁপে উঠতাম, আর পরস্পরের শরীরে উষ্ণতা খুঁজতাম। এই ফিলিংসটাই বেশি ভালো লাগতো! আসলে ভেজা শিশিরে হাঁটার নাম করে আমি এই ফিলিংসটুকু নিতে চাইতাম।
বৃষ্টি হলে দুজনে একসাথে ভিজতাম বাড়ির ছাদে। তুমি আমাকে পাঁজাকোলা করে নিতে, আমি তোমার গলা আলতো করে পেঁচিয়ে ধরে তোমার দিকে চেয়ে থাকতাম। বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিতো ভালোবাসার বর্ষণে। পাশের বাড়ির মেয়েটা তখন খালি চেয়ে থাকতো জানালা দিয়ে। ড্যাবড্যাব করে শুধু তোমাকে দেখতো। আমার ভীষণ রাগ হতো। ও নিজে একটা বিয়ে করে এভাবে বরের সাথে রোমান্স করতে পারে না? আমার বরের দিকে নজর কেন খালি? তুমি না থাকা অবস্থায় মেয়েটার সাথে কতবার যে ঝগড়া করেছি এজন্য, কখনও তোমাকে বলিনি।
নীল শাড়িটার কথা মনে আছে তোমার? ঐ যে, যেটা তুমি পহেলা বৈশাখে কিনে দিয়েছিলে। ওটা এখনও আছে আলমারির শাড়ির ভাজে। কখনও ধুলো জমতে দিইনি ওটাতে। মাঝেমাঝে তুমি ভেবে শাড়িটাকে এখনও জড়িয়ে ধরি। মনে আছে পহেলা বৈশাখের দিন আমাকে নিজ হাতে শাড়িটা পরিয়ে দিয়েছিলে তুমি? সেদিন আমি ঠোঁটে লিপস্টিক দিয়েছিলাম বলে তোমার সে কী বকা! তুমি যে লিপস্টিক পছন্দ করতে না, এটা আমার জানা ছিল না। জানলে কি আর দিতাম? আমার সব সৌন্দর্যই তো তোমার জন্য। তুমি যেভাবে সাজাতে আমি সেভাবে সাজতাম। ঐদিনের পর থেকে আমি কখনও ঠোঁটে লিপস্টিক লাগায়নি। ঐদিন তোমার বকা শুনেই পানি দিয়ে লিপস্টিক মুছে ফেলেছিলাম। তখন তোমার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠে। আমার ঠোঁটের লিপস্টিক মুছে যদি তোমার ঠোঁটে হাসি ফুটে তবে আমি আজীবন লিপস্টিক ছুঁয়ে না দেখতেও রাজি। মৃদু হেসে তুমি একটা নীল টিপ পরিয়ে দিলে কপালের ঠিক মাঝখানে, শাড়ির সাথে ম্যাচ করে। তারপর আমাকে বেডের উপর বসিয়ে নিজহাতে আমার পায়ের ধূলো ঝাড়লে, আর পা দুটো তোমার কোলের উপর নিয়ে নিজ হাতে পায়ে আলতা লাগিয়ে দিলে। বেশিরভাগ সময় তুমি নিজেই আমাকে সাজাতে। সাজানোর পর বলতে আয়নায় নিজেকে দেখতে সব ঠিক আছে কি না। আমি মৃদু হেসে জবাব দিতাম, তুমি থাকতে আমার আয়না দেখা লাগবে না। তুমিই তো আমার আয়না। জানো, এখনও আমার বাসায় আয়না রাখি না আমি। সাজি নাতো! কার জন্য সাজবো? কাকে দেখানোর জন্য সাজবো বলো? আচ্ছা এখন তুমি মিলিকেও সাজিয়ে দাও, আগে যেভাবে আমাকে সাজাতে? আমাকে যেভাবে ভালোবাসতে, এখন কি সব ভালোবাসা মিলিকে দাও? রাতের বেলায় তোমার বুকে মাথা রেখে কি সে ঘুমায়, যেভাবে আমি ঘুমাতাম? ভোর বেলায় সে কি তোমার ঘুম ভাঙায় শিশির ভেজা ঘাসে হাঁটবে বলে? নাকি এখন বেলা করে ঘুম থেকে উঠো? আচ্ছা, ঘরের সব জিনিসপত্র কি ওভাবে আছে, যেভাবে আমি সাজিয়ে এসেছিলাম? আলমারিটা একপাশে, বেডটা একপাশে, আলনাটা আরেক পাশে? নাকি এখন মিলি সব সাজিয়ে নিয়েছে নিজের মতো। ওতো আবার আমাকে সহ্য করতেই পারতো না। হয়তো আমার কোনো চিহ্ন রাখবে না বলে ও নিজের মতো করে সব সাজিয়ে নিয়েছে? একসময় তোমার দিকে তাকাতো বলে আমি পাশের বাড়ির মেয়েটার সাথে কতো ঝগড়া করেছিলাম, সেই তোমার অধিকার বেশি পাওয়ার জন্য পরবর্তীতে মিলিই আমার সাথে ঝগড়া করতো। তুমিও তখন ওর পক্ষ নিতে। আমি কেবল দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ভাবতাম, কতো সহজেই পাল্টে গেছো তুমি! আমার দোষ ছিল একটাই, আমি ছিলাম বন্ধ্যা। তোমাকে সন্তানের মুখ দেখানোর ক্ষমতা আমার ছিল না....
.
.
(চলবে....)

*




0 Comments 64 Views
Comment

© FriendsDiary.NeT 2009- 2019