FriendsDiary.NeT | Friends| Inbox | Chat
Home»Archive»

বাবাকে দেওয়া কথা অতঃপর

বাবাকে দেওয়া কথা অতঃপর

*

লিখা:-শিশির আহমেদ মেঘ
********************************

আকাশে মেঘের আনাগোনা চলছে। কালো মেঘে ছেয়ে আছে পুরো আকাশ। যে কোনো সময় ঝুম বৃষ্টি নামতে পারে। দেখে মনে হচ্ছে সন্ধ্যে নেমে গেছে। কিন্তু সন্ধ্যে হতে আরও অনেক সময় রয়েছে। অথচ দুপুরের আগে পর্যন্ত কী রোদটাই না উঠেছিল! আল্লাহর মহিমা বোঝা বড় মুসকিল। উনি বান্দাদের ভালোর জন্যই সব কিছু করেন। কিন্তু উনার বান্দারা বড্ড অকৃতজ্ঞ। যখন রোদ হয় তখন বলে, "এত গরমে থাকা যাচ্ছে না। বৃষ্টি হয় না কেন?" আবার যখন বৃষ্টি হয় তখন বলে, "দিনরাত বৃষ্টি হচ্ছে, কোনো কাজই হচ্ছে না। কখন যে বৃষ্টি ছাড়বে।" কিন্তু আল্লাহ'তালা সঠিক সময়ে সঠিক নেয়ামত দান করে থাকেন বান্দাদের জন্য। আসরের নামাজ পড়ে মসজিদেই বসে আছে রানা। আর মসজিদে বসে বসেই এসব ভাবছে সে।
আগামীকাল কুরবানি ইদ, কুরবানি দেওয়ার জন্য দুইটা গরু কিনেছে রানাদের বাড়িতে। প্রতি ইদেই অনেক আনন্দ করে সবাই মিলে। কিন্তু এবারে আনন্দ করার ইচ্ছে হচ্ছে না তার। ইচ্ছে হচ্ছে না বললে ভুল বলা হবে, আনন্দ করার মতো পরিবেশ তাদের বাড়িতে নেই। অথচ দিন পঁচিশেক আগেও সে কত কিছু ভেবেছে। ইদের দিনে এখানে যাবে, ওখানে যাবে, বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাবে। কিন্তু এখন কোথাও বেড়াতে যাওয়ার কোনো ইচ্ছেই তার নেই। এরকমটা হওয়ার কারণ হচ্ছে কিছুদিন আগেই রানার বাবা মারা যায়। বাবা হারানোর শোক এখনো কাঁটিয়ে উঠতে পারেনি সে। গত কুরবানি ইদেও যেখানে বাবার সাথে কাঁটিয়েছে আর এবারের কুরবানি ইদ তাকে বাবা ছাড়াই করতে হচ্ছে। এটা সে ভাবতেই পারেনি। আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। এইতো কাল কুরবানি ইদ কিন্তু বাবা থাকলে কত মজা করতো। ইদের দিন পাঞ্জাবী পরে বাবার সাথে হেঁটে হেঁটে ইদগাহ ময়দানে যেত। এক সাথে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তো। কিন্তু সেসবের কিছুই হবে না। কারণ, রানার বাবা যে আর নেই।
আজ কুরবানি ইদ। ফজরের নামাজ পড়ে এসে বাবার কবর জিয়ারত করে রানা। এরপর বাসায় আসে সে। ইদের জামাত সকাল আটটায় শুরু হবে। এর আগে মায়ের কাজে একটু সাহায্য করলো সে। এরপর গোসল করে ইদের নামাজ পড়তে ইদগাহ ময়দানে গেল রানা। নামাজ পড়ে এসে হুজুরের মাধ্যমে কুরবানির গরুটা জবাই করে নিলো। রানার বাবা থাকতে উনি নিজেই কুরবানি করতেন। কিন্তু রানা সেটা পারে না বলেই হুজুরকে দিয়ে করালেন।
দুপুর হতে হতে কুরবানির মাংস কাটা শেষ হয়েছে। এরপর রানা সঠিক নিয়মে কুরবানির মাংস বণ্টন করে বিলিয়ে দেয় অসহায় গরীব মিসকিনদের মাঝে। যখন দেখে ফকির মিসকিনদের মধ্যে মাংস দিতে দিতে মাংস শেষ হয়েছে কিন্তু এখনো কিছু ফকির মিসকিন রয়েছে মাংস নিতে তখন রানা তাদের বাড়ির ভাগ থেকে মাংস দিয়ে দিলো। তার এরকম কাণ্ড দেখে আশেপাশের মানুষজন বলতে লাগলো, "ছেলেটা ঠিক তার বাবার মতো হয়েছে। নিজের ভাগের অংশ থেকেও গরীবদের বিলিয়ে দিচ্ছে। বাবার মতো অসহায়দের কথা ভাবছে।" তাদের কথা রানার কান পর্যন্ত ঠিকই পৌঁছালো। রানা শুনে নিজেকে ধন্য মনে করছে। সে তার বাবার মতো হতে পেরেছে। তার বাবাকে দেওয়া কথা সে রাখতে পেরেছে।
রানার বাবা বেঁচে থাকতে যখন কুরবানি দিতেন তখন গরীব মিসকিনদের ভাগ শেষ হয়ে গেলে নিজের ভাগ থেকেও দিতেন।আর ইদের দিন নিজেদের খাওয়ার জন্য সামান্য পরিমাণ মাংস রাখতেন। এভাবে বিলিয়ে দিতে দেখে তখন সাগর তার বাবাকে বলতো, "বাবা, কুরবানির মাংস কী সব বিলিয়ে দেয় মানুষ? আমরা কুরবানি দিচ্ছি আর আমরা খেতে পারি না ভালো করে।" রানার কথা শুনে রানার বাবা তাকে ধমক দেয় আর বলে, "চুপ করো তুমি। কুরবানি কী নিজেরা খাওয়ার জন্য দেয়? কুরবানি মানে হচ্ছে নিজের প্রিয় জিনিসটাকে আল্লাহর রাস্তায় সপে দেওয়া। সেই সাথে নিজের মনের পশুকেও কুরবানি করা। সব কিছুর থেকে আল্লহকে বেশী ভালোবাসারই একটা পরীক্ষা এই কুরবানি করা। যা ইব্রাহিম (আ:) করেছিল। আর আমরা তো প্রায় সময় গরুর মাংস খাই কিন্তু যারা অসহায় গরীব তারা মাসে বছরেও খেতে পায় না গরুর মাংস। কুরবানির মাংসতে তাদের হক রয়েছে। নবীজীও এমন করতেন, গরীবরা একটু ভালো খাবে বলে নিজেরটুকুও দিয়ে দিতেন। তারা যেন এই একটা দিন ভালো মন্দ খেতে পারে। আর তুমি বলছো, কেন দিচ্ছি? আরে এসব বললে শুধু আমাদের গরু জবাই দেওয়াই হবে কিন্তু আল্লাহর কাছে আমাদের এই কুরবানির কোনো দাম থাকবে না।" বাবার কথা শুনে রানা অনুতপ্ত হয় আর বাবাকে বলে, "আমি ভুল করেছি বাবা। আমাকে ক্ষমা কর।" ছেলে ভুল বুঝতে পেরেছে সেই দেখে রানার বাবা খুব খুশি হয় আর বলে, "ক্ষমা আল্লাহর কাছে চাও আর আল্লাহর কাছে দোয়া করো, যেন আমাদের সব ভুলত্রুটি মাফ করে আমাদের এই কুরবানিকে কবুল করেন। আর হ্যাঁ আমি আজ আছি কাল নেই, তখনও কিন্তু এভাবেই অসহায় গরীবদের পাশে তুমি থাকবে। তাদের এইদিনের পরিপূর্ণ হক আদায় করবে।" বাবাকে আশ্বাস দিয়ে রানা বলে, "ঠিকাছে বাবা। আমি চেষ্টা করবো ঠিক তোমার মতো অসহায়দের পাশে দাঁড়াতে।"
আজ রানা তার কথা রেখেছে। বাবা মারা গেছেন কিছুদিন আগেই। আর এটাই বাবাকে ছাড়া রানার প্রথম কুরবানি ইদ। সে তার বাবার মতোই গরীবদের হক আদায় করেছে। সে আল্লাহর কাছে বাবার জন্য দোয়া করে। আর নিজের জন্যেও করে, যতদিন বেঁচে থাকবে ততদিন যেন এভাবেই আল্লাহর পথে থাকতে পারে। বাবাকে দেওয়া কথা সে রাখতে পারে।
আজ বাবাকে হারানোর ব্যথা থাকলেও রানার মনে অনেক শান্তি লাগে। সে পেরেছে বাবাকে দেওয়া কথা রাখতে। ইদের দিন বিকেলেই আবার বাবার কবরের পাশে গিয়েছে সে। বাবার কবরের পাশেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রানা ভাবছে, "বাবা চলে গেছেন কিন্তু রেখে গেছেন নিজের কর্মকে। যার মাধ্যমে আজ সবাই উনাকে এত ভালোবাসে। আর আমাকেও শিখিয়ে দিয়েছেন কিছু ভালো কাজ করার উপায়। এটাই আল্লাহর মহিমা। এতেই আল্লাহ আমার ভালো করবেন।" বলেই একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো রানা, সাথে দু'ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো রানার চোখ দিয়ে।
"""সমাপ্ত""

*




0 Comments 80 Views
Comment

© FriendsDiary.NeT 2009- 2019