FriendsDiary.NeT | Friends| Inbox | Chat
Home»Archive»

হ্যালো টু জিরো টু জিরো

হ্যালো টু জিরো টু জিরো

*

তোমাকে বলছি ২০২০। আরে! তোমার নামটা তো সুন্দর: টু-জিরো টু-জিরো । কেমন আছো? উত্তর দিচ্ছো না, ক্ষতি নেই। সময়ই বলে দেবে। অপরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলা কষ্টকর। তার পরও এই ঝুঁকিটা নিচ্ছি। কারণ এই সাহসটা পেয়েছি তোমারই অগ্রজ ২০১৯-এর কাছ থেকে। তাকেও একদিন এমনি করে প্রশ্ন করেছিলাম। সেও তোমার মতো নিরুত্তর ছিল। তোমাকে বলতে চাই কতগুলো গোপন বেদনার কথা। জানো, একসময় আমিও মানুষ ছিলাম। কেন? তুমি কি এখন মানুষ না? হয়তো। কিন্তু সেই মানুষ না। তিনিই সেই মানুষ, যিনি সমস্ত পৃথিবীর হয়ে দুঃখ পান।

নাফ ও রিও গ্রান্দের নদীতে অভিবাসী শিশুর লাশ ভাসতে দেখে আমি দুঃখ পাই না। এতটুকু কষ্ট পাই না যখন শিশু আয়লানের মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখি ভূমধ্যসাগরের বেলাভূমিতে। অথবা বোমায় বিধ্বস্ত ভবনে একমাত্র বেঁচে যাওয়া শিশু ওমরানের চাক চাক রক্ত দেখে। এ জন্যই বলছিলাম, যিনি মানুষ তিনি সমস্ত পৃথিবীর হয়ে দুঃখ পান।

দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ বুয়েট। এর শেরে বাংলা হল। ২০১১ ও ২০০৫ নম্বর কক্ষ! এ দুটি কক্ষে আনা হলো মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে। সেখানেই তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হলো। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যিনি বাঁচতে চেয়েছিলেন। হাসপাতালে নেওয়ার কথা বলেছিলেন। কই, আমিতো তাঁকে বাঁচাতে যাইনি। তাঁকে তো হাসপাতালেই নিইনি। তাঁর জন্য তো দুঃখ পাইনি।

এবার তোমাকে বলতে চাই এক দুর্বৃত্ত অধ্যক্ষের কথা। তাঁর নামটা বড় খানদানি। বাংলার এক নবাবের নামে নাম। তাঁর ছিল এক সংশপ্তক ছাত্রী। নাম ছিল তার নুসরাত জাহান রাফি। প্রায়ই তিনি অশোভন আচরণ করতে চাইতেন নুসরাতের সঙ্গে। আর নুসরাত, প্রতিবারই এর প্রতিবাদ করত। একদিন সেই অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার নির্দেশে তাঁকে পুড়িয়ে হত্যা করা হলো! নুসরাতের শেষ উচ্চারণ ছিল, ‘শিক্ষক আমার গায়ে হাত দিয়েছে। শেষনিশ্বাস পর্যন্ত আমি এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করব।’

আমার থেকে নিষ্ঠুর আর কে আছে বলো? নুসরাতকে জ্বলতে দেখেও বাঁচানোর জন্য এগিয়ে যাইনি। চোখ থেকে এক ফোঁটা জলও ঝরেনি।

চারদিকে এত অন্যায়, অমানবিকতা দেখি। অত্যাচার, নিষ্ঠুরতা দেখি। গুম, খুন, হত্যা, ধর্ষণের কথা শুনি। হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের কথা শুনি। এক কেজি পেঁয়াজের দাম হয় ২৪০ টাকা! সুদূর মিসরের পেঁয়াজ কিনে মনের দুঃখে রেললাইন ধরে বাসায় ফিরি। কই? আমিতো এসবের প্রতিবাদ করি না। লজ্জায় মাথা নত করি না। তাইতো তোমাকে বলছিলাম একসময় আমিও মানুষ ছিলাম।

দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে আগুন চকবাজারের চুড়িহাট্টায়। কিছুক্ষণের মধ্যে না ফেরার দেশে চলে গেল ৭৮টি প্রাণ। একটু আগেই যাদের জীবন ছিল,একটু পরেই তারা হলো লাশ! জানো, টু-জিরো টু-জিরো? চাঁদের মতো ফুটফুটে দুটো মেয়ে ছিল। ফাতেমা তুজ জোহরা ও রেনুমা তাবাসসুম। এরা ছিল দারুণ বান্ধবী। চতুর্থ শ্রেণি থেকে একই স্কুলে পড়ত। কলেজজীবনে পড়েছে একই কলেজে। তাদের বন্ধুত্ব ছিল ইতিহাসে লিখে রাখার মতো। দুই বান্ধবীর জন্যই দুই পরিবারের মধ্যেও বন্ধুত্ব হয়েছিল।

সেদিন শিল্পকলায় অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফিরছিল রিকশায়। নিয়তি তাদের টেনে নিয়ে যায় চুড়িহাট্টায়। আর যায় কোথায়? মুহূর্তেই ছাই হয়ে গেল দুটি অনিন্দ্য সুন্দর জীবন। পৃথিবীতে তারা বেঁচে ছিল একসঙ্গে। তাঁরা হয়তো মরণও চেয়েছিল একসঙ্গে। হায়রে বিধাতা!

সে দিন অনেক দিন পর দুই বান্ধবীর ছবি দেখে প্রায় কেঁদেই ফেলেছিলাম। এই প্রথম নিজেকে একটু একটু মানুষ মানুষ মনে হচ্ছিল।

শোনো টু-জিরো টু-জিরো। অধৈর্য হয়ো না। তুমি কি ভাবছ আগুনের গল্প শেষ? না ভাই। আরও আছে। শেষ হলে যে বনানীর এফ আর টাওয়ার অভিশাপ দেবে। এফ আর টাওয়ারের আগুনও ছিল ভয়ংকর। এ আগুনে ১৯ জন মানুষের প্রাণ গিয়েছিল।

যে সময় তোমরা সঙ্গে কথা বলছি, ঠিক সে সময়ে প্রচণ্ড শীতে কাঁপছে সারা দেশ। গরিব মানুষ নিশ্চয়ই শীতে কষ্ট পাচ্ছে। আর আমি অনেকগুলো কাপড় পরেও বলছি, আহ কি শীত! কই, আমি তো এসব মানুষের জন্য কিছু করছি না। তাইতো তোমাকে বলছিলাম যে, আমি আর আগের মতো নেই।

একবার ভাবো আমাদের শিশুদের কথা। তাদের শৈশব বলে কিছু নেই। তোমার জানার কথা না। আমরা তখন শৈশবে। আমরা জানি আমাদের শৈশব কত আনন্দের ছিল! সে সময় পড়ালেখা ছিল অকাজ। কাজ ছিল গ্রীষ্মের দুপুরে ঢিল ছুড়ে আম পাড়া। পাখি ধরা। নদীতে সাঁতার কাটা। ঘুড়ি ওড়ান। দাড়িয়াবান্ধা, ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন আরও কত কি খেলা। এ-পাড়ায় ও-পাড়ায় ঘোরাঘুরি। রাতে দাদি-নানির কাছে গল্প শোনা। জোনাকি ধরা। সে এক দারুণ সময়! এখনকার শিশুরা সেসব ভাবতেও পারবে না।

আমরা বড়রা তাদের শৈশব কেড়ে নিচ্ছি। প্রচণ্ড শীতের ভোরে নিজের ওজন থেকে বেশি ওজনের বইয়ের বোঝা নিয়ে স্কুলে যায় শিশুরা। স্কুল থেকে থেকে কোচিং। কোচিং থেকে বাসায় ফিরে দেখে সোফায় বসে আছেন গৃহশিক্ষক।

কেউ ভাবছে না পড়ালেখার মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ খেলাধুলা, আনন্দ-বিনোদন। অনেক দিন পর আজ আবার মনে পড়ছে সেই নিষ্পাপ দুটি শিশুর কথা। এরা ছিল আপন দুই ভাই। নাম ছিল অরণি ও আলভি। একদিন নিজের মা তাদের গলা টিপে শ্বাস রোধ করে হত্যা করে! তাদের অপরাধ, পড়াশোনা রেখে একটু খেলতে চায়। এখনো হয়তো ঢাকার বনশ্রীর বাতাসে মিশে আছে তাদের মৃত্যুর গন্ধ।

তুমিই বলো টু-জিরো টু-জিরো। কোনোভাবে এটা মেনে নেওয়া যায়? কিন্তু আমি তো নিয়েছি। শিশুদের শৈশব হরণ ও জিপিএ-৫-নির্ভর শিক্ষার জন্য আমার তো মন খারাপ হয় না। আমি তো একবারও প্রতিবাদ করি না। এ জন্যই তোমাকে বললাম, একসময় আমিও মানুষ ছিলাম।

আরও অনেক কষ্টের কথা আছে। সব কি আর বলা যায়?
আগে আমরা গরিব ছিলাম। কিন্তু আমাদের একজনের প্রতি অন্যজনের গভীর ভালোবাসা ছিল। মায়া মমতা ছিল। আবেগ অনুভূতি ছিল। সুখে-দুঃখে মানুষের পাশে থাকতাম।

এখন মধ্য আয়ের দেশ হতে যাচ্ছি। আমাদের ঐশ্বর্য বাড়ছে। কিন্তু কেড়ে নিচ্ছে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, সহমর্মিতা। কাছে ও পাশে থাকার মানসিকতা। আমরা ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছি। আগের সেই মায়ামমতা, কাছে আসা, পাশে থাকা, ভালোবাসা সব যেন হারিয়ে যাচ্ছে।

মৃত্যুর চেয়ে বেদনার আর কী হয়? মৃত্যু হলো শব্দহীন জগতের প্রতিধ্বনি। এক নৈঃশব্দ্য জগৎ। সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এনজিওর প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ। আরও চলে গেলেন সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা। চলে গেলেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী ব্যক্তিত্ব অজয় রায়, কবি আল মাহমুদ, নাট্যকার, অভিনেতা ও ভাষাসৈনিক মমতাজউদদীন আহমদ, একুশে পদকপ্রাপ্ত সমাজকর্মী পলান সরকারসহ আরও অনেক বিশিষ্টজন।

বিদায়ের আগে একটু অনুরোধও করে রাখি তোমার কাছে, হে সময়। ২০১৮-১৯ আমাদের অনেক কষ্ট দিয়েছে। তুমি ওদের মতো হয়ো না। তুমি ভালো হয়ে এসো। আপন হয়ে এসো। বন্ধু হয়ে এসো। তোমাকে নিয়ে যেন ২০২১-এর কাছে অভিযোগ করতে না হয়।

আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি, মত-পথ হয়তো আলাদা। কিন্তু আমাদের দুঃখ, আমাদের অশ্রু, আমাদের আনন্দ, আমাদের রক্তের রং সব এক। স্রষ্টার কাছে সবাই সমান। কারও প্রতি তাঁর বৈষম্য নেই। জগতের সাবইকে দেখে রেখ। নতুন সময়, কাউকে কষ্ট দিয়ো না। এটুকু প্রার্থনা তোমার কাছে।


কৃতজ্ঞতা
আশফাকুজ্জামান
প্রথম আলো বন্ধুসভা

*




2 Comments 234 Views
Comment

© FriendsDiary.NeT 2009- 2020