FriendsDiary.NeT | Friends| Inbox | Chat
Home»Archive»

ধ্বংসের মুখে পৃথিবীর ফুসফুস খ্যাত আমাজন রেইন ফরেস্ট!

ধ্বংসের মুখে পৃথিবীর ফুসফুস খ্যাত আমাজন রেইন ফরেস্ট!

*

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এবং গহীন রেইন ফরেস্ট হচ্ছে দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন রেইন ফরেস্ট। আসলে মূল আমাজনটি হচ্ছে একটি বেসিন বা প্রাকৃতিক জলাশয়। প্রায় ৫৫ লক্ষ বর্গ কিলোমিটারের এই বিশাল আমাজন রেইন ফরেস্টের ৬০% পড়েছে ব্রাজিলে, পেরুতে পড়েছে ১৩% এবং কলাম্বিয়াতে পড়েছে ১০%। বাকী ১৭% আমাজন ভেনিজুয়েলা, ইকেয়ডর, বলিভিয়া, গায়না ও সুরিনামের মধ্যে থেকে গড়ে উঠেছে পৃথিবীর ফুসফুস খ্যাত সুবিশাল ঘন সবুজ এই আমাজন রেইন ফরেস্ট। তাছাড়া পরিবেশ বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন যে, আমাজন মহাবন ৫৬ মিলিয়ন থকে ৪০ মিলিয়ন বছর আগে সৃষ্টি হয়। সে হিসেবে এটি পৃথিবীর অতি প্রাচীন রেইন ফরেস্ট হিসেবে পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক রেইন ফরেস্ট নিয়ে এই বিশাল আমাজন এখনো পর্যন্ত পৃথিবীর বুকে টিকে রয়েছে। তাছাড়া দক্ষিণ আমেরিকার মহাবন আমাজনে আজ থেকে প্রায় ২১ হাজার বছর আগে থেকেই মানব জাতির বসবাসের পদচিহ্ন খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

সারা আমাজন রেইন ফরেস্ট জুড়ে ৪০ হাজার উদ্ভিদ প্রজাতি ও ১৬ হাজারের অধিক বৃক্ষ প্রজাতিসহ মোট ৩৮০ বিলিয়ন বা তার কাছাকাছি গাছপালা ও লতাপাতা রয়েছে। শুধু কি গাছপালা এর পাশাপাশি রয়েছে ২.৫০ মিলিয়ন প্রজাতির কীটপতঙ্গ এবং পোকামাকরের বাস। তাছাড়া ১৩০০ এর অধিক প্রজাতির পাখি দেখতে পাওয়া যায় সারা আমাজন বেসিন জুড়ে। যা কিনা বিশ্বের মোট পাখির তিন ভাগের এক ভাগ হতে পারে। আবার ৪৩০ এর অধিক প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৪০০ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ১,০০০ এর কাছাকাছি উভচর প্রজাতির অন্যান্য প্রানীর এক মহা মিলন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে এই মহাবনটি। অন্যদিকে আমাজনে ছড়িয়ে থাকা ৬,৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সুবিশাল নদী এবং সারা আমাজন বেসিন জুড়ে প্রায় ৫,৬০০ প্রজাতির বিভিন্ন ধরণের মাছ ও জলজ প্রানী দেখতে পাওয়া যায়।

ল্যাতিন আমেরিকার এই সুবিশাল আমাজন রেইন ফরেস্টকে বলা হয় পৃথিবীর ফুসসুস। কারণ এই রেইন ফরেস্টেই পৃথিবীর অক্সিজেনের চাহিদার একাই ২০% পর্যন্ত বায়ুমণ্ডলে সরবরাহ করে থাকে। যদিও ২০% অক্সিজেন সরবরাহের বিষয়টি অনেকটাই সঠিন নয়। কারণ আমাজন রেইন ফরেস্টের গাছপালা বায়ূমণ্ডলে অক্সিজেন ছাড়ার পাশাপাশি আবার অক্সিজেনের একটি বড় অংশই নিজেই শুষে নেয়। তবে শেষ পর্যন্ত প্রায় ৯% পর্যন্ত অক্সিজেন বায়ুমণ্ডলে সরবরাহ করতে সক্ষম হয় বলে মনে করা হয়। তবে আমাজন রেইন ফরেস্ট আসল যে কাজটা করে তা হলো যে, বায়ুমণ্ডল থেকে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড শুষে নিয়ে পরিবেশকে ঠাণ্ডা রাখে এবং বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ জলীয় কনা ছেড়ে দেয়। আর বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা এখনো পর্যন্ত ০.০৪% বা তার সামান্য বেশি থাকতে পারে। আর এর পেছনে মূল অবদানটা রয়েছে আমাজন রেইন ফরেস্টের।

তবে মানুষের কারণে কোন দিন আমাজন রেইন ফরেস্ট ধ্বংস হয়ে গেলে পরিবেশে কিন্তু এক মহা বিপর্যয় নেমে আসবে। বায়ুমণ্ডলে থাকা ক্ষতিকর কার্বন ডাই অক্সাইডের ভারসাম্য একেবারে বিনষ্ট হয়ে তা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। তাছাড়া আমাজনের পুরো বাস্তুতন্তে প্রায় ২২০ মেট্রিক গিগাটন কার্বন ডাই অক্সাইড মজুত রয়েছে। যাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কার্বনপুল বলা যেতে পারে। আর আমাজনের এই গাছপালা ধ্বংস করা হলে এতে থাকা বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড সরাসরি পৃথিবীর বায়ু মণ্ডলে প্রবেশ করবে এবং এক হিসেব মতে, সেক্ষেত্রে বায়ু মণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বর্তমানের চেয়ে ৩০% পর্যন্ত বেশি বৃদ্ধি পাবে বলে আশাঙ্খা করা হয়। তাই বর্তমানের বায়ু মণ্ডলে থাকা কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা ০.০৪% থেকে তা মাত্র ০.০৫% এ বৃদ্ধি পেলেও তা কিন্তু পৃথিবীর জন্য হবে এক বিপর্যয়কর পরিস্থিতি। এখানে কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা ০.০৫% কে খুবই অল্প পরিমাণ মনে করা হলেও তা কিন্তু নিশ্চিতভাবেই বায়ুমণ্ডলের ভারসাম্য নষ্ট করে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ৩ থেকে ৫ ডিগ্রী পর্যন্ত বৃদ্ধি করার জন্য যথেষ্ঠ। তাই এখানে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইড আসলে কি করে তা আমাদের জানতে হবে। বায়ুমণ্ডলের থাকা কার্বন ডাই অক্সাইড সূর্যের তাপকে শোষণ করে তা বায়ুমণ্ডলেই আটকে রেখে গ্রীন হাউস সৃষ্টির মাধ্যমে পৃথিবীর তাপমাত্রাকে বৃদ্ধি করে। আমাজন রেইন ফরেস্ট ধ্বংস হয়ে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাইওক্সাইডের মাত্রা দ্বিগুণ বা তিনগুণ হয়ে গেলে, সেক্ষেত্রে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রাও নিশ্চিতভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকবে।

আমাদের পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ৭৮.০৮% নাইট্রোজেন, ২০.৯৫% অক্সিজেন, আর্গন ০.৯৩৪%, কার্বন ডাই অক্সাইড ০.০৪১%, নিয়ন ০.০০১৮%, হিলিয়াম ০.০০০৫২৪%, মিথেন ০.০০০১৮৭% গ্যাস এবং জলীয়বাষ্পের পরিমাণ ১.০০% থেকে ৩.০০% পর্যন্ত হতে পারে। তবে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ অনেক কম মনে হলেও এর মাত্র ৩০% বৃদ্ধি আমাদের পৃথিবীর জন্য এক ভয়ঙ্কর বিপদ হয়ে দেখা দিতে পারে। যেমনটা আমাদের সৌরজগতে পৃথিবীর জমজ বোন শুক্র গ্রহের ক্ষেত্রে দেখা যায়। শুক্র গ্রহের বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ ৯৬.৫০% এবং এর সারফেস টেমপারেচর ৪৬৭ ডিগ্রী সেলসিয়াস। আর এই ভয়ানক তাপমাত্রা শুক্র গ্রহকে সৌর জগতের সবচেয়ে গরম পাথুরে গ্রহে পরিণত করেছে। তাই ভবিষ্যতে পৃথিবী থেকে পর্যায়ক্রমে সকল গাছপালা ও প্রাণিকূল ধ্বংস হয়ে গেলে মানব জাতিকে হয়ত আগামী ১০০ বছরের মধ্যে একেবারে শক্র গ্রহের মতো না হলেও বেশ বড় রকমের ভয়ঙ্কর পরিণতি ভোগ করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

আমরা পৃথিবীবাসী প্রতিনিয়ত বিভিন্ন জীবাষ্ম জ্বালানী পুড়িয়ে বিপুল পরিমাণ ক্ষতিকর কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস উৎপন্ন করি এবং তা কিন্তু সরাসরি বায়ুমণ্ডলেই গিয়ে জমা হয়। আর আমাজন রেইন ফরেস্ট কিন্তু সেই জমাকৃত কার্বন ডাই অক্সাইডের একটি বড় অংশ পরিবেশ থেকে শুষে নিয়ে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে। আবার আমাজনে বিভিন্ন উদ্ভিদের এত দ্রুত বেড়ে ওঠার পেছনেও এই অতিরিক্ত কার্বন ডাই অক্সাইডের একটি বড় অবদান রয়েছে বলে মনে করা হয়। সেক্ষেত্রে আমাজন বন যে কোন কারণে ধ্বংস হয়ে গেলে খুব দ্রুতই বায়ুমণ্ডলে গ্রীন হাউস গ্যাসের মাত্রা বেড়ে গিয়ে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশগত বিভিন্ন ধরণের ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। আর এই গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত প্রত্যক্ষ ক্ষতিকর প্রভাব হিসেবে পৃথিবীর দক্ষিণ ও উত্তর মেরুর ট্রিলিয়ন টন বরফ গলে গিয়ে মহাসাগরের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে এবং মালদ্বীপের মতো পৃথিবীর নিম্নাঞ্চলে থাকা অনেক দেশই তলিয়ে যাবে ২০৫০ সালের আগেই।

আর আমাজন ধ্বংসের কারণে এর ক্ষতিকর প্রভাব যে শুধুমাত্র আমাজন রেইন ফরেস্ট এলাকার আশে পাশে দেখা দিবে বিষয়টি কিন্তু মোটেও তা নয়। বরং আস্তে আস্তে সারা পৃথিবী জুড়ে খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে মানব জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর বিরুপ প্রভাব আঘাত হানতে শুরু করে দিবে। যার আলামত ইতোমধ্যেই কিন্তু শুরু হয়ে গেছে। কয়েক দশকের মধ্যে ২০১৯ সালটি ছিল উষ্ণতম বছর। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে মধ্যপ্রচ্যের দেশ কুয়েতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৬২ ডিগ্রী। তাছাড়া বেশ কড়েক বছর থেকে পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলোতেও স্বাভাবিকের তুলনায় অধিক তাপমাত্রা আশাঙ্খাজনক হারে লক্ষ্য করা যায়।

তবে অত্যন্ত দূঃখজনক হলেও সত্য যে, বর্তমানে আমাজন রেইন ফরেস্ট মানুষ্য জনিত কারণে বিলুপ্তির বা হুমকির মুখে পড়ে রয়েছে। বিশেষ করে রেইন ফরেস্টের ৬০% এলাকা ল্যাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিলে থাকায় আমাজন ধ্বংসজনিত সমস্যাটি আরো ভয়ঙ্কর আকার হয়ে দেখা দিয়েছে। কারণ বর্তমানে ব্রাজিলের ডানপন্থী কট্টর সরকার রেইন ফরেস্ট এলাকায় আরো বেশি মাত্রায় ফার্ম ভিত্তিক কৃষি জমি উদ্ধার এবং শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার জন্য প্রতি বছর হাজার হাজার হেক্টর আমাজন বনভূনি আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করে ফেলছে। এক হিসেব মতে ২০১৯ সালে আমাজন বনভূমিতে নির্বিচারে কমপক্ষে ১৯ হাজার বার আগুন লাগানো হয়েছে। আর এটা করা হয়েছে একেবারেই ইচ্চাকৃতভাবেই। এতে করে লক্ষ লক্ষ একর বনভূমি ধ্বংসের পাশাপাশি হাজারো প্রজাতির প্রাণি ইতোমধ্যেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের পরিবেশ বিজ্ঞানী এবং পরিবেশ প্রেমীরা আমাজন নিধনের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদ, র‍্যালি ও সেমিনার করলেও ব্রাজিলের কট্টর সরকার কিন্তু আমাজন রেইন ফরেস্ট ধ্বংস করতে এক রকম বদ্ধপরিকর বলেই প্রতিয়মান হয়। তাছাড়া অতি সাম্প্রতিক সময়ে ব্রাজিলের সরকার সুবিশাল আমাজন রেইন ফরেস্টের মধ্য দিয়ে হাজার হাজার মাইল মহাসড়ক তৈরির এক মহা পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। আর এভাবে নির্বিচারে আমাজন রেইন ফরেস্ট ধ্বংস করা হলে হয়ত ২০৫০ সালের মধ্যেই পৃথিবীর ফুসফুস খ্যাত এই মহাবন তার আকার ৫৫ লক্ষ বর্গ কিলোমটার থেকে মাত্র ৫ লক্ষ বর্গ কিলোমিটারে এসে যে পৌছাবে না তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। আর ২১০০ সালে মহাবন আমাজনের আর কোন অস্তিত্বি খুজে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। যা কিনা পৃথিবীর মানব সভ্যতার জন্য এক ভয়াবহ অভিশাপ হয়ে দেখা দিতে পারে।

*




0 Comments 47 Views
Comment

© FriendsDiary.NeT 2009- 2020