FriendsDiary.NeT | Friends| Inbox | Chat
Home»Archive»

একজন প্রকৃত যোদ্ধা

একজন প্রকৃত যোদ্ধা

*

ওডারল্যান্ডের জন্ম ১৯১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর হল্যান্ডের রাজধানী আমস্টারডাম শহরে আর পিতৃভূমি ছিল অস্ট্রেলিয়ায়।
জীবিকার তাগিদে ওডারল্যান্ড ১৭ বছর বয়সে লেখাপড়া ছেড়ে কিছুদিন জুতা পালিশের কাজ করেন। পরে হল্যান্ডের বাটা কোম্পানিতে যোগ দেন। এর মধ্যেই ১৯৩৯ সালে ১ সেপ্টেম্বর শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
.
যুদ্ধ শুরুর সময় জার্মানির নাৎসি বাহিনী জন্মভূমি নেদারল্যান্ড বা হল্যান্ড আক্রমণ করলে চাকরি ছেড়ে দিয়ে ওডারল্যান্ড ১৯৩৬ সালে ডাচ সেনাবাহিনীতে গেরিলা কমান্ডো হিসেবে যোগ দেন এবং সার্জেন্ট পদ পান।
ঘটনাক্রমে ১৯৪০ সালে জার্মানির নাৎসি বাহিনীর বিমান হামলায় হল্যান্ডের রটারডাম শহর বিধ্বস্ত হয়ে যায়, হল্যান্ড চলে যায় তাদের দখলে। ওডারল্যান্ড বন্দি হন জার্মানদের হাতে। কিন্তু বন্দিশিবির থেকে পালিয়ে এসে আবার যোগ দেন ডাচ-প্রতিরোধ আন্দোলনে। ডাচদের বিভিন্ন আঞ্চলিক ও জার্মান ভাষা রপ্ত ছিল তার। এই সুবাদে তিনি জার্মানদের গোপন আস্তানায় ঢুকে পড়েন। কাজ করতে শুরু করেন ডাচ আন্ডারগ্রাউন্ড রেজিসট্যান্স মুভমেন্টের গুপ্তচর হিসেবে। ১৯৪৩ সালে তিনি আবার ডাচ কমান্ডো বাহিনীতে যোগ দিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ করেন বীরত্বের সঙ্গে। যুদ্ধ শেষে ওডারল্যান্ড পুরান চাকরিতে যোগ দেন।
.
১৯৭০ সালের শেষের দিকে ওডারল্যান্ড বাংলাদেশের ঢাকার বাটা কম্পানির
প্রোডাকশন ম্যানেজার হয়ে নেদারল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে আসেন এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ পান। তখন পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা ছিল সংকটাপন্ন।
.
টঙ্গীর বাটা জুতা কারখানা তখন তার কর্মস্থল। ১৯৭১ সালের ৫ মার্চ টঙ্গির মেঘনা টেক্সটাইল মিলের সামনে শ্রমিক-জনতার মিছিলে ইপিআর-এর সদস্যদের গুলিবর্ষণের ঘটনা, মার্চের গণ আন্দোলন, ২৫শে মার্চ কালরাত্রিতে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ, বর্বরতা ওডারল্যান্ড নিজের চোখে দেখেন।
.
২৫ মার্চের অপারেশন সার্চলাইট এবং এর পরবর্তী সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্বিচার হত্যাকাণ্ড ও নৃশংস বর্বরতা দেখে মর্মাহত হন এবং যুদ্ধে বাংলাদেশকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নেন।
এরই প্রেক্ষিতে তিনি একটি পরিকল্পনা ছক তৈরি করেন। বাটা কোম্পানির মত একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও একজন বিদেশি নাগরিক হওয়াতে পশ্চিম পাকিস্তানে অবাধ যাতায়াতের সুযোগ ছিল তার। তৎকালিন পশ্চিম পাকিস্তানের বাটার পার্সোনাল ম্যানেজার কর্নেল (অবঃ) নেওয়াজকে কৌশলে কোম্পানির কাজে ঢাকায় ডেকে আনেন।
.
এই অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল এবং নিজের যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জেনারেল টিক্কা খান, জেনারেল নিয়াজি ও জেনারেল রাও ফরমান আলী প্রমুখের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন, যারা মূলত পূর্ব পাকিস্তানে হামলার প্রধান নির্দেশক ছিলেন।
নিয়াজীর ইস্টার্ন কমান্ড হেডকোয়ার্টার ওডারল্যান্ডকে 'সম্মানিত অতিথি' হিসাবে সম্মানিত করে। এই সুযোগে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের সব ধরনের 'নিরাপত্তা ছাড়পত্র' সংগ্রহ করেন। এতে করে সেনানিবাসে যখন তখন যত্রতত্র যাতায়াতে তার আর কোন অসুবিধা থাকল না। বরং তিনি প্রায়ই সেনানিবাসে সামরিক অফিসারদের আলোচনা সভায় অংশগ্রহণের সুযোগ পান।
.
এক পর্যায়ে তিনি পশ্চিমা হানাদারদের গোপন সংবাদ সংগ্রহ করা শুরু করলেন এবং তা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাটার বিশ্বস্ত কর্মচারিদের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পাঠাতেন। ফলে মুক্তিযুদ্ধের সময় বর্বর হানাদারবাহিনীর অনেক গোপন তথ্য ও গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ পরিকল্পনার কথা মুক্তিবাহিনী জানতে পারে।
শুধুমাত্র গোয়েন্দা তৎপরতাই নয়, মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার সরবরাহ, আর্থিক সহায়তাসহ নানা উপায়ে সাহায্য করতেন। একপর্যায়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জ্ঞানকে পুঁজি করে স্বয়ং ২নং সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা গেরিলা শাখার সক্রিয় সদস্য হিসেবে টঙ্গীর বাটা কারখানা ও কয়েকটি গোপন ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়মিত গেরিলা রণকৌশলের প্রশিক্ষণ দিতেন। রক্তে তার যুদ্ধের নেশা আর তাই শুধু প্রশিক্ষণ দিয়ে তার তৃপ্তি হলো না, এক সময় প্রত্যক্ষ সমরে নেমে পড়েন ওডারল্যান্ড।
.
তার নেতৃত্বে ঢাকা ও এর আশেপাশের এলাকাগুলোতে মুক্তিবাহিনীর কমান্ডোরা অতর্কিত হামলা চালিয়ে টঙ্গী-ভৈরব ও রেললাইনের ব্রিজ, কালভার্ট ধ্বংস করে হানাদার বাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। কমান্ডো হিসাবে ওডারল্যান্ড ছিলেন একজন অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ। এছাড়াও বর্হিবিশ্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সপক্ষে জনমত গড়ে তুলতে ১৯৭১ সালে গোপনে বাংলাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর শিশু ও নারীর ওপর বর্বরতার অনেক ছবি তুলেছিলেন তিনি।
.
১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধ শেষ হবার পর ওডারল্যান্ড ঢাকায় নিজ কর্মস্থলে যোগদান করেন। এবং ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থান করে অবসর নিয়ে পিতৃভূমি অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে যান।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ ও অসামান্য নৈপুণ্যের কারণে বাংলাদেশ সরকার তাকে ‘বীরপ্রতীক’ খেতাব দেয়।
মানবতার প্রতি নিবেদিত প্রাণ এই মানুষটি অস্ট্রেলিয়ার পার্থ শহরের হাসপাতালে ২০০১ সালের ১৮ মে চলে যান না ফেরার দেশে।

*




0 Comments 75 Views
Comment

© FriendsDiary.NeT 2009- 2020