FriendsDiary.NeT | Friends| Inbox | Chat
Home»Archive»

আজীবন অপরাজিত সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ

আজীবন অপরাজিত সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ

*

খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) ছিলেন মুসলিম ইতিহাসে এক মহান সেনাপতি। রণক্ষেত্রে নিজের শক্তি ও মেধা দিয়ে ইসলামের ঝান্ডাকে সমুন্নত রেখেছিলেন। মিসরের খ্যাতনামা সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক আব্বাস মাহমুদ আল-আক্কাদ ‘আবকারিয়াতু খালিদ’ গ্রন্থে তার সামরিক ব্যক্তিত্বের পর্যালোচনা করে বলেন, ‘সামরিক নেতৃত্বের সব গুণাবলিই খালিদ (রা.)-এর মধ্যে ছিল। বাহাদুরি, সাহসিকতা, উপস্থিত বুদ্ধি, তীক্ষ্ম মেধা, ক্ষিপ্রতা এবং শত্রুর ওপর অকল্পনীয় আঘাত হানার ব্যাপারে তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়।’ আজীবন অপরাজিত থাকা এই বীরকে নিয়ে লিখেছেন আন্দালিব আয়ান

জন্ম ও বেড়ে ওঠা
খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) আনুমানিক ৫৯২ সালে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা ছিলেন কুরাইশ বংশের বনু মাখজুম গোত্রের শেখ। খালিদের (রা.) মা লুবাবা আল-সুগরা বিনতে আল-হারিস ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সহধর্মিণী মায়মুনা বিনতে আল-হারিসের (রা.) চাচাত বোন।

জন্মের পর কুরাইশদের ঐতিহ্য অনুযায়ী খালিদকে (রা.) মরুভূমির বেদুইনদের কাছে পাঠানো হয়। এখানে মরুভূমির শুষ্ক, বিশুদ্ধ আলো-বাতাসে পালক মায়ের কাছে তিনি লালিত-পালিত হন। পাঁচ বা ছয় বছর বয়সে তিনি মক্কায় নিজের বাবা-মায়ের কাছে ফিরে আসেন। বাল্যকালে তিনি গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তার জীবন রক্ষা পেলেও তার মুখে বসন্তের চিহ্ন রয়ে গিয়েছিল।

খালিদ (রা.) অশ্বারোহণ, বর্শা নিক্ষেপ, তীর-ধনুক ব্যবহার, তলোয়ার চালনায় দীক্ষা নিয়েছিলেন। বর্শা ছিল তার পছন্দের অস্ত্র। তরুণ বয়সে তিনি যোদ্ধা ও কুস্তিগির হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমরের (রা.) মামাতো ভাই।

ইসলাম গ্রহণ
৬২৮ সালে হুদাইবিয়ার সন্ধির ফলে মুসলিম ও মক্কার কুরাইশদের মধ্যে দশ বছরের শান্তি স্থাপিত হয়। এ সময় খালিদ (রা.) ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। ৬২৯ সালের মে মাসে খালিদ (রা.) মদিনার উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথিমধ্যে আমর ইবনুল আসের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। তিনিও ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে মদিনায় যাচ্ছিলেন। তারা একত্রে মদিনায় পৌঁছান এবং প্রিয় মুহাম্মদ (সা.) এর কাছে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন।

সাইফুল্লাহ উপাধি লাভ
গাসানিদের বিরুদ্ধে অভিযানে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) জায়িদ ইবনে হারেসাকে (রা.) সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ দেন। তার মৃত্যু হলে জাফর ইবনে আবি তালিব (রা.) এবং তারও মৃত্যু হলে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) সেনাপতি হবেন এই নির্দেশও দেওয়া হয়। আর তারা সবাই শহীদ হলে নিজেদের মধ্য থেকে যে কোনো একজনকে সেনাপতি নির্বাচন করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

যুদ্ধে তিনজনই শহীদ হলে খালিদকে (রা.) সেনাপতি নির্বাচন করা হয়। এ সময় তার অধীনে মাত্র ৩ হাজার সৈনিক ছিল। অন্যদিকে বাইজেন্টাইন ও তাদের মিত্র গাসানি আরবদের ছিল ১০ হাজার সৈনিক। এই কঠিন পরিস্থিতিতেও খালিদ (রা.) কৌশল প্রয়োগ করে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের পরিস্থিতি থেকে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেন। এই যুদ্ধের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে, খালিদের (রা.) নয়টি তলোয়ার ভেঙে গিয়েছিল। এমন কৃতিত্বের জন্য রাসুল (সা.) তাকে সাইফুল্লাহ বা আল্লাহর তলোয়ার উপাধিতে ভূষিত করেন।

পরবর্তী সামরিক অভিযান
হুদাইবিয়ার সন্ধি বাতিল হওয়ার পর ৬৩০ সালে মুসলিমরা মক্কা বিজয়ের জন্য অগ্রসর হন। এই অভিযানে খালিদ (রা.) মুসলিম বাহিনীর চারটি ভাগের একটির নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। এই চারটি বাহিনী চারটি ভিন্ন পথ দিয়ে মক্কায় প্রবেশ করে। সেই বছর তিনি হুনাইনের যুদ্ধ ও তাইফ অবরোধে অংশ নেন। তাবুক অভিযানে তিনি মুহাম্মদ (সা.)-এর অধীনে অংশ নিয়েছিলেন। সেখান থেকে তাকে দাওমাতুল জান্দালে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি লড়াই করে সেখানকার আরব শাসককে বন্দি করেন। ৬৩১ সালে তিনি বিদায় হজে অংশ নেন।

সেনাপতি হিসেবে সামরিক অভিযান
৬৩০ সালের জানুয়ারিতে খালিদকে (রা.) দেবি আল-উজ্জার মূর্তি ধ্বংস করার জন্য পাঠানো হয়। তিনি এই দায়িত্ব সম্পন্ন করেন। বনু জাজিমা গোত্রকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার জন্য খালিদকে (রা.) পাঠানো হয়েছিল। তারা ‘আমরা সাবিয়ান হয়ে গেছি’ বলে ঘোষণা করে। এরপর খালিদ (রা.) তাদের বন্দি করেন এবং কয়েকজনকে হত্যা করেন। এরপর আবদুর রহমান ইবনে আউফ তাকে বিরত করেন।

দুমাতুল জান্দালের দুর্গে অবস্থানরত খ্রিস্টান শাসক উকাইদিরকে আক্রমণের জন্য খালিদকে (রা.) অভিযানে পাঠানো হয়। ৬৩১ সালের মার্চে এই অভিযান সংঘটিত হয়। এই অভিযানে খালিদ উকাইদিরকে বন্দি করেন। পরে মুহাম্মদ (সা.) তাকে মুক্তি দেন। মুক্তিপণ হিসেবে উকাইদিরকে ২ হাজার উট, ৮০০ ভেড়া, ৪০০ বর্ম ও ৪০০ বর্শা প্রদান করতে হয় এবং জিজিয়া প্রদানের শর্ত মানতে হয়। ৬৩১ সালের এপ্রিলে পৌত্তলিক দেবতা ওয়াদের মূর্তি ধ্বংস করার জন্য খালিদকে দুমাতুল জান্দালের দ্বিতীয় অভিযানে পাঠানো হয়। এই অভিযানও সফলভাবে সমাপ্ত করেন তিনি।

আবু বকরের (রা.) যুগ (৬৩২-৬৩৪)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মৃত্যুর পর কিছু বড় বড় গোত্র প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.)-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। কিছুসংখ্যক মুসলমান তাদের পূর্বের ধর্মে ফিরে যায়। কিছু লোক ভণ্ড নবুয়তের দাবি করে বসে, অনেকে ইসলামি কোষাগারে যাকাত দিতে অস্বীকৃতি জানায়, এরকম ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক জটিলতা সৃষ্টি হয়। যা খলিফা আবু বকর (রা.) শক্ত হাতে দমন করেন। ইসলাম ত্যাগী তথা রিদ্দার যুদ্ধের মাধ্যমে মুসলমানরা তাদের কিছু শক্তিক্ষয় করলেও তাদের ভেতরের যে সকল লোক শুধু মুখে বা ক্ষমতা দখলের জন্য সুযোগ সন্ধান করছিল, তাদের পরিচয় প্রকাশ হয়ে পড়ে এবং তারা সমূলে উৎপাটিত হয়। এতে মুসলমানদেরই অনেক উপকার হয়। তারপরই শুরু হয় ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় যুদ্ধের দামামা। যার নেতৃত্ব দেন খালিদ বিন ওয়ালিদ।

পারস্য সাম্রাজ্যে অভিযান
বিদ্রোহ দমনের পর সমগ্র আরব উপদ্বীপ খিলাফতের অধীনে ঐক্যবদ্ধ হয়। এরপর আবু বকর (রা.) খিলাফতের সীমানা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেন। খালিদকে (রা.) ১৮ হাজার সৈনিকসহ পারস্য সাম্রাজ্যে পাঠানো হয়। তাকে পারস্য সাম্রাজ্যের সবচেয়ে সম্পদশালী অঞ্চল তথা নি¤œ মেসোপটেমিয়ার ইউফ্রেটিস অঞ্চল (বর্তমান ইরাক) জয়ের জন্য পাঠানো হয়। খালিদ (রা.) তার বাহিনী নিয়ে নিম্ন মেসোপটেমিয়ায় প্রবেশ করেন। যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে খালিদ প্রতিপক্ষকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়ে এক চিঠিতে লেখেন- ‘ইসলামে প্রবেশ করো এবং নিরাপদ থাকো। অথবা জিজিয়া দেওয়ার ব্যাপারে সম্মত হও এবং তোমরা ও তোমাদের জনগণ আমাদের নিরাপত্তা লাভ করো। অন্যথা ফলাফল নিয়ে তোমরা নিজেদেরই দায়ী করবে, তোমরা জীবনকে যেভাবে আকাক্সক্ষা করো আমি মৃত্যুকে সেভাবে আকাক্সক্ষা করি।’

ধারাবাহিক চারটি যুদ্ধে খালিদ (রা.) দ্রুত বিজয় অর্জন করেন। এগুলো হলো শেকলের যুদ্ধ (এপ্রিল ৬৩৩), নদীর যুদ্ধ (তৃতীয় সপ্তাহ, এপ্রিল ৬৩৩), ওয়ালাজার যুদ্ধ (মে ৬৩৩) এবং উলাইসের যুদ্ধ (মধ্য মে ৬৩৩)।

৬৩৩ সালের মে মাসের শেষ সপ্তাহে নিম্ন মেসোপটেমিয়ার আঞ্চলিক রাজধানী আল-হিরার পতন ঘটে। ওই অঞ্চলের অধিবাসীরা জিজিয়া প্রদান করতে রাজি হয় এবং মুসলিমদের সহায়তা দিতে সম্মত হয়। ৬৩৩ সালের জুনে খালিদ (রা.) আনবার অবরোধ করলে শহরটি আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। এরপর তিনি দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হন এবং জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে আইনুল তামির জয় করেন।

এ সময় পারস্যের সেনাবাহিনী ও তাদের মিত্র আরব খ্রিস্টানদের সেনা সমাবেশের খবর পান। এসব বাহিনী ইউফ্রেটিস অঞ্চলের চারটি ভিন্ন ক্যাম্পে ঘাঁটি করেছিল। এগুলো হলো হানাফিজ, জুমাইল, সানিই এবং মুজাইয়া। খালিদ (রা.) তাদের সম্মিলিত বাহিনীর সঙ্গে লড়াই না করে বরং তিনদিক থেকে পৃথক রাত্রিকালীন আক্রমণ চালান। এর মাধ্যমে ৬৩৩ সালের নভেম্বরে মুজাইয়ার যুদ্ধ, এরপর সানিইর যুদ্ধ এবং জুমাইলের যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

মুসলিমদের এসব বিজয়ের ফলে নিম্ন মেসোপটেমিয়া জয়ের জন্য পার্সিয়ানদের প্রচেষ্টা হ্রাস পায় এবং পার্সিয়ান রাজধানী তিসফুন অরক্ষিত হয়ে পড়ে। রাজধানীর ওপর হামলা চালানোর পূর্বে খালিদ (রা.) দক্ষিণ ও পশ্চিমের সকল পার্সিয়ান শক্তিকে উৎখাতের সিদ্ধান্ত নেন। এরপর সীমান্ত শহর ফিরাজের দিকে অগ্রসর হয়ে সাসানীয়, বাইজেন্টাইন ও খ্রিস্টান আরবদের সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করেন। ৬৩৩ সালের ডিসেম্বরে সংঘটিত ফিরাজের যুদ্ধে শহরের দুর্গ অধিকার করা হয়। তার নিম্ন মেসোপটেমিয়া জয়ের অভিযানে এটা ছিল শেষ যুদ্ধ। ইরাকে অবস্থানকালীন খালিদ (রা.) বিজিত অঞ্চলের সামরিক গভর্নর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যে অভিযান
ইরাক জয়ের পরপরই খালিদ (রা.) খলিফার নির্দেশে বসরায় যান ও পূর্বে অবস্থানরত মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে যোগদান করেন। খালিদ সেখানে পৌঁছেই বসরায় আক্রমণ করেন। তার আক্রমণে হতভম্ব হয়ে বসরাবাসী ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে তাদের শান্তিচুক্তি করে। এরপর খালিদ সিরিয়ার দিকে অগ্রসর হন। সিরিয়ায় অভিযানের প্রথমেই খালিদ দামেস্ককে প্রায় ছয়মাস অবরোধ করে রাখেন। কিন্তু দুর্গ প্রাচীর অতিক্রম করতে পারেননি। এ সময় এক পাদ্রীর পুত্রসন্তান জন্মের কারণে আনন্দে নগরীর অধিবাসীরা মদপানে মত্ত ছিল। তাই সময় বুঝে একদিন রাতে খালিদ তার কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে দুর্গ প্রাচীর অতিক্রম করে ভেতরে প্রবেশ করেন ও দ্বাররক্ষীদের হত্যা করেন। ফলে নগরের প্রধান ফটক মুসলমানদের কাছে উন্মুক্ত হয়। অকস্মাৎ আক্রমণে ভীত হয়ে তারা ত্বরিত সিদ্ধান্ত নিয়ে মুসলমানদের সঙ্গে সন্ধি করে। খালিদ যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত হয়ে দেখতে পান বিভিন্ন কমান্ডার পৃথকভাবে সৈন্য পরিচালনা করছেন। তখন খালিদ যোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে এক গুরুগম্ভীর ভাষণ প্রদান করেন। তিনি বলেন, ‘আজ এ দিন আল্লাহর কাছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। তোমরা গর্ব অহংকার থেকে বিরত থাকো। তোমরা খালেসভাবে যুদ্ধ করো। তোমাদের কাজের জন্য প্রভুর সন্তুষ্টি কামনা করো। এসো আমরা নেতৃত্ব ভাগাভাগি করি। কেউ আজ কেউ আগামী ও কেউ পরশু আমির হই। আর আজকের দিন আমার ওপর ছেড়ে দাও’।

তার এই তেজোদ্দীপ্ত বক্তব্যকে সবাই সমর্থন দিল। প্রধান সেনাপতি পদে অধিষ্ঠিত হয়ে খালিদ মুসলিম সেনাদলকে এমনভাবে বিন্যস্ত করলেন যে আরবরা কোনোদিন এমন বিন্যস্তকরণ চোখে দেখেনি। অতঃপর তুমুল যুদ্ধ শুরু হলো। রোমানরা এমনভাবে আক্রমণ করল যে আরবরা এরকম বিপদে ইতিপূর্বে কখনো নিমজ্জিত হয়নি। মুসলিম বাহিনীর মাঝখানের দায়িত্বে ছিলেন কাকা ও ইকরামা। খালিদ তাদের ও সমস্ত মুসলিম বাহিনীকে আক্রমণের নির্দেশ দিলেন। ফলে যুদ্ধ সর্বোচ্চ রূপ ধারণ করল। হযরত খালিদও তীব্র আক্রমণ চালালেন। তিনি যেদিকে গেলেন সেদিকের রোমান বাহিনী ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। তাদের শোচনীয় পরাজয় হলো। এ যুদ্ধে লক্ষাধিক রোমান সৈন্য নিহত হয়।

ইয়ারমুকের যুদ্ধ
সম্রাট হেরাক্লিয়াসের প্রধান সেনাপতি মাহানের অধীনে অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত দুই লক্ষ চল্লিশ হাজার সৈন্যবাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল ইয়ারমুকের যুদ্ধে। মাহান দূতের মাধ্যমে মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে কথা বলার প্রস্তাব দেন। ১০০ অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে রোমক সেনাপতির শিবিরে গিয়ে পৌঁছেন খালিদ। সেনাপতি মাহানের উদ্দেশ্য ছিল ভয়ভীতি, শান-শওকত ঐশ্বর্য দেখিয়ে মুসলিমদের দুর্বল করা কিন্তু খালিদ যখন স্বর্ণ ও রৌপ্য নির্মিত ও কারুকার্য-খচিত চেয়ারগুলো সরিয়ে রেখে নিঃসংকোচে মেঝেতে আসন গ্রহণ করলেন, তখন সেনাপতি মাহান নিজেই মনে মনে দুর্বল হয়ে পড়েন।

মাহান প্রস্তাব দেন, মুসলমানরা যুদ্ধ থেকে বিরত থাকবে বিনিময়ে প্রত্যেক মুসলিম সৈন্যকে একশত দিনার, মুসলিম সেনাপতিকে তিনশত দিনার এবং খলিফাকে দশ হাজার দিনার দান করবেন। কিন্তু খালিদ দুটি পাল্টা প্রস্তাব রাখলেন ইসলাম গ্রহণ করুন নতুবা জিজিয়া দিন। রোমক সেনাপতি দাম্ভিকতার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেন, তরবারির মাধ্যমে ফয়সালার ঘোষণা দেন।

খালিদ বিন ওয়ালিদ স্পষ্ট অথচ কঠোর ভাষায় জানিয়ে দেন, যুদ্ধের বাসনা তোমাদের চেয়ে আমাদেরই বেশি এবং আমরা অবশ্যই তোমাদের পরাজিত করব। আর বন্দি করে খলিফার দরবারে হাজির করব। মাহান তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, এখনই তোমার সামনে তোমাদের পাঁচজন সঙ্গীকে হত্যা করছি। দুই লক্ষাধিক সৈন্যবাহিনীর সামনে সেনাপতি মাহানকে জিম্মি করে ১০০ অশ্বারোহী মুসলিম সৈন্যকে নিয়ে স্বীয় তাঁবুতে ফিরে আসেন খালিদ। যা ছিল ইয়ারমুক যুদ্ধে জয়লাভের প্রথম পদক্ষেপ। পরবর্তী সময়ে হজরত খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বেই ইয়ারমুকের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী জয়লাভ করে।

সেনাপ্রধান থেকে পদচ্যুতি
দামেস্ক অবরোধের সময় আবু বকর (রা.) মৃত্যুবরণ করেন। এরপর উমর (রা.) নতুন খলিফা হন। উমর (রা.) খালিদকে (রা.) পদচ্যুত করে আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহকে (রা.) সিরিয়ায় মুসলিম বাহিনীর কমান্ডার নিয়োগ দেন। অবরোধ চলাকালীন আবু উবাইদা (রা.) তার নিয়োগ ও খালিদের (রা.) পদচ্যুতির চিঠি পেয়েছিলেন কিন্তু শহর জয় করার পূর্ব পর্যন্ত তিনি খবর জানানো থেকে বিরত ছিলেন।

সে সময় খালিদ অপরাজেয় হওয়ায় অনেক মুসলিম তার কারণে যুদ্ধে বিজয় অর্জিত হচ্ছে বলে বিশ্বাস করতে শুরু করেন। এই ব্যাপারে উমর (রা.) বলেছিলেন, ‘আমি খালিদ বিন ওয়ালিদকে (রা.) আমার ক্রোধ বা তার দায়িত্বহীনতার কারণে অব্যাহতি দিইনি, এর কারণ ছিল আমি লোকদের জানাতে চাইছিলাম যে বিজয় আল্লাহর তরফ থেকে আসে।’

খালিদ (রা.) খলিফার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে নির্দেশ অনুযায়ী আবু উবাইদার (রা.) অধীনে একজন সাধারণ সৈনিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। আবু উবাইদার নেতৃত্বে সিরিয়া অভিযান চলতে থাকে। তিনি খালিদের গুণগ্রাহী ছিলেন। তিনি খালিদকে অশ্বারোহী বাহিনীর নেতৃত্ব প্রদান করেন এবং নিজের সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন।

উত্তর সিরিয়া জয়
এমেসা ইতিমধ্যে হস্তগত হয়েছিল। আবু উবাইদা (রা.) ও খালিদ (রা.) চেলসিসের দিকে যাত্রা করেন। কৌশলগত কারণে এটি বাইজেন্টাইনদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ ছিল। এখান থেকে তারা আনাতোলিয়া, আর্মেনিয়া ও এন্টিওককে রক্ষা করতে সক্ষম ছিলেন। আবু উবাইদা (রা.) খালিদকে (রা.) সম্পূর্ণ মোবাইল গার্ড বাহিনী প্রদান করে চেলসিসের দিকে পাঠান। কমান্ডার মেনাসের অধীনে গ্রিক সৈনিকরা এটি প্রহরা দিচ্ছিল। বলা হয় যে মেনাস সম্রাটের পর দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তি ছিলেন। তিনি বাইজেন্টাইনদের প্রথা মাফিক কৌশল বাদ দিয়ে খালিদের (রা.) মুখোমুখি হওয়ার এবং মুসলিমদের মূল বাহিনী এসে পৌঁছার পূর্বে অগ্রবর্তী দলকে ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেন। চেলসিস থেকে ৫ কি.মি. পূর্বে অবস্থিত হাজিরে সংঘটিত হাজিরের যুদ্ধে রোমানরা পরাজিত হয়। এই বিজয়ের পর উমর খালিদের (রা.) সামরিক কৃতিত্বের প্রশংসা করেছিলেন। আবু উবাইদা (রা.) শিগগিরই চেলসিসে খালিদের সঙ্গে যোগ দেন। ৬৩৭ সালের জুন মাসে চেলসিস আত্মসমর্পণ করে। এই বিজয়ের ফলে চেলসিসের উত্তরের অঞ্চল মুসলিমদের কাছে উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। এরপর খালিদ ও আবু উবাইদা (রা.) অক্টোবরে আলেপ্পো অধিকার করেন। এর পরের লক্ষ্যবস্তু ছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের এশীয় অঞ্চলের রাজধানী এন্টিওক। এন্টিওকের দিকে যাত্রা করার পূর্বে খালিদ ও আবু উবাইদা (রা.) শহরটিকে আনাতোলিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেন। এই উদ্দেশ্যে এন্টিওককে কৌশলগত প্রতিরক্ষা প্রদানকারী সকল দুর্গকে দখল করা হয়। এর মধ্যে এন্টিওকের উত্তর-পূর্বের আজাজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অরন্টেস নদীর কাছে বাইজেন্টাইন বাহিনীর সঙ্গে মুসলিম বাহিনীর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধ লোহা সেতুর যুদ্ধ নামে পরিচিত। বাইজেন্টাইনরা পরাজিত হওয়ার পর এন্টিওকে আশ্রয় নিলে মুসলিমরা শহর অবরোধ করে। সম্রাটের দিক থেকে সাহায্যের আশা ক্ষীণ হওয়ায় সকল বাইজেন্টাইন সৈনিককে নিরাপদে কনস্টান্টিনোপল যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে এই শর্তে ৬৩৭ সালের ৩০ মার্চ এন্টিওক আত্মসমর্পণ করে।

সেনাবাহিনী থেকে পদচ্যুতি
খালিদ (রা.) এক সময় তার কর্মজীবনের সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছান। তিনি খ্যাত হয়ে ওঠেন এবং মুসলিমদের কাছে তিনি জাতীয় বীর গণ্য হতেন। জনসাধারণ তাকে সাইফুল্লাহ বলে ডাকত। মারাশ অধিকার করার কিছুকাল পর তিনি জানতে পারেন যে, খ্যাতনামা কবি আশ’আস তার প্রশংসা করে একটি কবিতা লিখেছেন। খালিদ (রা.) খুশি হয়ে তাকে ১০ হাজার দিরহাম উপহার হিসেবে দেন।

উমর (রা.) এই ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় হিসেবে বিবেচনা করেন। উমর আবু উবাইদাকে (রা.) চিঠি লিখে খালিদের অর্থের উৎস বের করার নির্দেশ দেন। বলা হয়েছিল যে, যদি খালিদ (রা.) রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে দেন তবে তা ক্ষমতার অপব্যবহার। আর যদি তিনি নিজের অর্থ প্রদান করেন তবে তা অপচয়। উভয় ক্ষেত্রেই তিনি দোষী সাব্যস্ত হবেন। আবু উবাইদাকে এ কাজের দায়িত্ব দেওয়া হলেও তিনি খালিদের গুণগ্রাহী ছিলেন এবং ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন। ফলে এই দায়িত্ব পালন তার জন্য কঠিন ছিল। এর পরিবর্তে তিনি বিলাল ইবনে রাবাহকে এই দায়িত্ব দেন এবং খালিদকে চেলসিস থেকে এমেসায় তলব করেন। খালিদ নিজের অর্থ থেকে ওই উপহার দিলেও অপচয়ের অভিযোগে তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে খালিদের সামরিক জীবনের ইতি ঘটে।

মৃত্যুর আগে খালিদ (রা.) তার সম্পদ উমরের (রা.) হাতে অর্পণ করে যান এবং উমরকে (রা.) নিজ অসিয়তের বাস্তবায়নকারী মনোনীত করেছিলেন। পদচ্যুতির চার বছর পর ৬৪২ সালে খালিদ (রা.) ইন্তেকাল করেন। তাকে এমেসায় দাফন করা হয়। সামরিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর থেকে তিনি সেখানে বসবাস করছিলেন। তার মাজার বর্তমানে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) মসজিদের অংশ।

তিনি যুদ্ধে শহীদ হতে ইচ্ছুক ছিলেন তাই বাড়িতে মৃত্যুর পূর্বে তিনি বিমর্ষ হয়ে যান। মৃত্যুর পূর্বে তিনি বেদনা নিয়ে বলেন, ‘আমি শহীদ হওয়ার ইচ্ছা নিয়ে এত বেশি যুদ্ধে লড়াই করেছি যে আমার শরীরের কোনো অংশ ক্ষতচিহ্নবিহীন নেই, যা বর্শা বা তলোয়ারের কারণে হয়নি। এরপরও আমি এখানে, বিছানায় পড়ে একটি বৃদ্ধ উটের মতো মারা যাচ্ছি। কাপুরুষদের চোখ যাতে কখনো শান্তি না পায়।’

এ কথা শুনে খালিদের স্ত্রী বলেন, ‘আপনাকে সাইফুল্লাহ (আল্লাহর তলোয়ার) উপাধি দেওয়া হয়েছে এবং আল্লাহর তলোয়ার ভাঙতে পারে না আর তাই আপনি শহীদ হিসেবে নয় বরং বিজয়ী হিসেবে মৃত্যুবরণ করবেন।’

*




2 Comments 56 Views
Comment

© FriendsDiary.NeT 2009- 2020