FriendsDiary.NeT | Friends| Inbox | Chat
Home»Archive»

পরিবর্তন

পরিবর্তন

*


সুপ্তির বিয়ে ঠিক হয়েছে। ছেলে ইঞ্জিনিয়ার। নাম মঈন। সুপ্তির ছেলে খুব পছন্দ হয়েছে৷ কেমন বোকাসোকা, লাজুক। রেস্টুরেন্টে খেতে বসে ওর চোখের দিকে একদম তাকাতেই পারছিল না। এই জামানায় কোনো ছেলের এতো লজ্জা থাকে নাকি। সুপ্তির ইচ্ছা হচ্ছিলো মঈনের গাল ধরে টিপে দেয়। আশেপাশে লোকজন না থাকলে দিতোও হয়তো। তারপর মঈনের অবস্থা কি হতো সেটা দেখে মজা পাওয়া যেত নির্ঘাত। বেচারা লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যেত। বাকি জীবন ছেলেটাকে প্রচুর জ্বালাবে ও। দুইজন মিলে সারা বাংলাদেশ ঘুরবে। বাংলাদেশ শেষ হলে তারপর যাবে দেশের বাইরে।
.
এসব ভাবতে ভাবতেই সুপ্তি বাসায় ফিরছিল রিক্সাতে করে। হঠাৎ রিক্সাওয়ালা ব্রেক কষলো। সামনে কেউ একজন এসে দাড়িয়েছে। মিজান। সুপ্তির বুকের মধ্যে ধক করে উঠলো। মিজানকে খুব ভালো করে চেনে ও। বহুদিন হলো ওর পেছনে ঘুরছে ছেলেটা। এলাকার প্রভাবশালী নেতার একমাত্র পুত্র। সরকারি দলের রাজনীতি করে। সবাই খুব ভয় পায়। মিজানের পেছনে শুকনো মত আরো দুইজন। মিজান রিক্সার ব্রেকে হাত রেখে বলে, 'কি ব্যাপার সুপ্তি, কই যাও?'
সুপ্তি ঢোক গেলে, 'বাসায় যাচ্ছি।'
- শুনলাম তোমার নাকি বিয়ে ঠিক হয়েছে।
- হ্যা ঠিকই শুনেছেন।
সুপ্তি রিক্সা থেকে নেমে হাটা শুরু করে। ওদের বাসা অল্প একটু সামনেই।
মিজান পেছন পেছন আসে, 'আমি যে তোমাকে ভালোবাসি, এটা জানো না?'
'তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি আরো আগেই বলেছি আমার পক্ষে সম্ভব না কিছু। সুপ্তি জোরে জোরে হাটতে থাকে।'
মিজান পেছন থেকে সুপ্তির হাত টেনে ধরে। বলে, 'তুমি না বললেই কি আর হয়ে যাবে নাকি! আমার ভালোবাসার কোনো দাম নেই? সুন্দরী হইছো বলে এতো দেমাগ কেন!'
.
সুপ্তির কি হয়ে যায় ও জানে না। বাম হাতে টান পড়তেই ঘুরে ডান হাত দিয়ে ঠাস করে একটা চড় মারে মিজানের মুখ বরাবর। মিজান গাল চেপে ধরে পিছিয়ে যায়। হাত ছেড়ে দেয়। সুপ্তি দৌড়ে গলি ক্রস করে মূল রাস্তায় চলে আসে।
মোড়ের মুদি দোকানে ঢুকে পড়ে। হাফাচ্ছে। দোকানদার সামাদ কাকা সুপ্তিকে দেখে চিন্তিত গলায় বলেন, 'কি ব্যাপার মামনি, কোনো সমস্যা?'
'না আঙ্কেল, কিছু হয়নি। একটা পানি দেন তো। ঠান্ডা দিয়েন।'
সামাদ কাকা ফ্রিজ খুলে পানির বোতল এগিয়ে দেয়। সুপ্তি ঢকঢক করে পানি খেয়ে বাসার দিকে রওয়ানা হয়। পেছন ঘুরে মিজান বা তার দলের কাউকে না দেখতে পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।
.
চড় খেয়ে মিজান এদিক ওদিক তাকায়। কেউ দেখেনি তো। দেখে ফেললে মান সম্মান সব যাবে। রাগে গা কাপে মিজানের।
পাশ থেকে সবুজ বলে, 'ভাই, আপনাকে চড় দিলো!'
মিজান কোনো কথা বলে না। চুপ করে থাকে।
সবুজ আবার বলে, 'ঐ খানকির এতো বড় সাহস আপনারে চড় দেয়। আর আপনি কিছুই বললেন না৷'
মিজান তারপরও চুপ করে থাকে। হাত দিয়ে গাল ঘষতে ঘষতে একটা সিগারেট ধরায়। আস্তে আস্তে বলে, 'চুপ থাক সবুজ। সময় আসুক।'
ঠিক তিনদিন পর মোড়ের দোকান থেকে ফ্লেক্সিলোড দিয়ে রাস্তা ক্রস করার সময় সবার সামনে মাইক্রোবাস থামিয়ে সুপ্তিকে টেনে হিচড়ে গাড়িতে তুলে নেয় মিজান। মোড়ের সবাই চেয়ে চেয়ে দেখে। কেউ কিছু বলে না। কারো সাহস নেই বলার। মিজানের অনেক ক্ষমতা। সুপ্তির সেদিন ছিলো গায়ে হলুদ।
ধর্ষণ শেষে সন্ধ্যার দিকে শহরের বাইরে একটা পুরাতন ফার্মহাউসে সুপ্তিকে ফেলে রেখে বের হয়ে আসে মিজান। সুপ্তি চেয়ে চেয়ে দেখে। চিৎকার করার ক্ষমতাও হারিয়েছে৷ শুধু চোখ দিয়ে জল গড়ায়।
সবুজ বলে, 'ভাই, ঐ মেয়ে তো আমাদের চেহারা দেখে ফেলেছে। আসেন মেরে ফেলি। নাইলে থানাপুলিশ করবে। ঝামেলা হবে।'
মিজান হাসে, 'ধর্ষিতা মানে বুঝস?'
- না ভাই।
- ঐ মাইয়া এখন ধর্ষিতা। বাসায় গিয়ে কাউরে কিছু বলতে পারবে না। বললে কি হবে জানিস, সবাই ওরেই ছি ছি করবে। বিয়ে ভাইঙ্গা যাবে। কোনো পোলা নাই বাংলাদেশে যে একজন ধর্ষিতারে বিয়ে করবে। সুতরাং এই ঘটনা ওরা চাইপা যাবে। মেয়ের সম্মান হইলো আগে। লোক জানাজানি হলে সম্মান থাকবো? আর থানাপুলিশের ব্যাপার আমার ওপর ছাইড়া দে। কোনো বান্দিরপুতের ক্ষমতা আছে এই মিজানরে জেলে দেয়ার?'
.
বাসায় ফিরে কাঁদে সুপ্তি। কাঁদে ওর মা আর ছোটভাইও। সুপ্তির বাবা আসলাম খান অনেক্ষণ চুপ করে থেকে বলেন, 'এখন কি করার?'
সুপ্তির মা বলেন, 'ছেলেপক্ষকে কিছু বলার দরকার নেই। ভালোই ভালোই বিয়েটা হয়ে যাক, তারপর সবকিছু দেখা যাবে।'
- কিন্তু কথা কি আর চাপা থাকবে? এলাকার সবাই জেনে গেছে এতোক্ষণে। এইসব ব্যাপার হাওয়ার আগে মানুষের কানে যায়।
- তাহলে উপায়?
আসলাম খান মাথা নেড়ে বলেন, 'আমি বেয়াই সাহেবকে সব খুলে বলি। এই বিয়ে না হয় না হোক। মেয়েটাকে একটু সময় দেই। বিয়ের কথা পরে ভাববো।'
- পুলিশের কাছে যাবা নাকি?
- লাভ নাই। মিজানদের অনেক ক্ষমতা। কিছু করা যাবে না।
.
সুপ্তি সারারাত ঘুমায় না। ব্যাথা বেদনায় কাঁদতে থাকে একভাবে। ব্যাথা শারিরীক যতটা না, তারচেয়ে অনেক বেশি মানসিক।
.
কিন্তু পরদিন সকালে খুব অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটে। যেটা কোনোভাবেই ঘটার কথা না। কিন্তু তারপরও ঘটে।
মিজান প্রতিদিনের মত বেলা করে ঘুম থেকে উঠে মোড়ের সামাদ কাকার দোকানে এসে চা সিগারেট চাইলে সামাদ নামের বয়স্ক দোকানদার মানুষটা আস্তে আস্তে বলেন, 'ধর্ষকের কাছে মাল বেচুম না ভাই। অন্য কোথাও দেখো।'
হুট করে মিজানের মাথায় রক্ত উঠে যায়। চোখমুখ শক্ত করে বলে, 'কি বললেন, আপনি কি বললেন!'
সামাদ কাকা এবার একটু জোরেশোরে বলে, 'রেপিস্টের কাছে মাল বেচি না আমি।'
মিজান দোকানের শাটারে লাথি মারে। চিৎকার করে বলে, 'খোদার কসম আমি দোকান ভেঙে ফেলবো। কসম!'
সামাদ কাকা কোনো কথা না বলে চুপচাপ বসে থাকে। মিজান রেগেমেগে বের হয়ে যায়। পুরো মোড়ের সব মানুষ চেয়ে থাকে অবাক হয়ে।
.
দুপুরের দিকে মঈনের মা আর মঈন আসে সুপ্তিদের বাসায়। মঈনের মা আফরোজা বেগম হাইস্কুলের টিচার। উনি সুপ্তির হাত ধরে বলেন, 'মা রে আমরা সবই শুনেছি। তোমার সাথে যা যা হয়েছে তা একদমই ঠিক হয়নি। ঐ ছেলের ফাসি হওয়া উচিত৷ কিন্তু আমাদের দেশের আইন তোমাকে তোমার বিচার পাওয়ার অধিকার হয়তো দিতে পারবে না। কিন্তু এখানে তোমার তো কোনো দোষ নেই। সব দোষ ঐ ছেলের। তুমি পুরোপুরি নিস্পাপ। তাহলে তুমি কেন নিজেকে অপরাধী ভাবছ? আজ ধর্ষনের বদলে যদি তোমার ব্যাগ ছিনতাই হয়ে যেত তাহলেও কি তোমরা ভাবতে যে বিয়ে ভেঙে দিব আমরা? ব্যাগ ছিনতাই হওয়াতেও যেমন তোমার দোষ নেই তেমনি এই ঘটনাতেও নেই। আমি চাই বিয়ে সময়মতোই হোক। আমরা খুব খুশি হবো তুমি আমার ছেলেটাকে বিয়ে করতে রাজি হলে।'
কথা বলতে বলতে আফরোজা বেগম চোখ মোছেন।
সুপ্তি মঈনের দিকে তাকিয়ে বলে, 'এই বিয়েতে আপনার কোনো আপত্তি নেই।'
মঈন মাথা নাড়ে, 'অবশ্যই না। যেদিন আমি তোমাকে প্রথম দেখেছি সেদিন থেকেই ঠিক করেছি বাকি জীবন আমি সবসময় তোমার পাশে থাকবো। তোমার ভালো খারাপ যেকোনো মুহুর্ত একসাথে সামলাবো। আমি আরো ভেবে অবাক হচ্ছিলাম যে এই বিয়ে ভাঙার কথাই বা কেন হচ্ছে যেখানে তুমি কোনো দোষই করোনি। আমরা গায়ে হলুদের সব সরঞ্জাম নিয়ে এসেছি। তোমার বান্ধবীদের খবর দাও। আর একটু কাছে আসো তোমার চোখটা মুছিয়ে দেই।'
.
দুপুরে যখন সুপ্তিদের বাসায় গায়ে হলুদ হচ্ছিলো তখন বাজারের বিসমিল্লাহ হোটেলে ভাত খেতে যায় মিজান। গরুর কালা ভুনা অর্ডার দিয়ে অনেক্ষণ বসে থাকার পরও যখন খাবার আসে না তখন মিজান ওয়েটারকে বিশ্রী একটা গালি দিয়ে দেরি হওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করলে ওয়েটার চলে যায়। কিছুক্ষণ পর ম্যানেজার এসে বলে, 'স্যরি স্যার, আমরা আমাদের হোটেলে ধর্ষকদেরকে খাবার দেই না।'
মিজান কিছু বলতে গিয়েও বলে না। চুপচাপ হোটেল থেকে বের হয়ে আসে। আসার সময় দেখে সামনের রমিজ মিয়ার সেলুনে বড় বড় করে কাগজে লেখা রয়েছে, 'ধর্ষক বাদে বাকি সবার চুল কাটা হয়।'
এই সেই রমিজ মিয়া যে দুইদিন আগেও মিজানকে বড়ভাই বলে বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলত তার এতো সাহস!
.
মিজান বাসায় ফিরে সবুজকে ফোন দিয়ে বলে, 'এক বোতল পেট্রোল কিনে বাসায় আয়। বাজারের কয়েকটা দোকানে আগুন দিব আমি। পাবলিকের বহুত বাড় বাড়ছে।'
সবুজ কাচুমাচু গলায় বলে, 'ভাই, পেট্রোল কোন দোকান থেকে কিনবেন। কেউ কিছুই বিক্রি করতেছে না। আমি দিনাজপুর খালার বাসায় চলে আসছি। কখন পাবলিক ধরে মাইর দেয় কে জানে। পরিস্থিতি খুব গরম।'
.
মিজানের প্রচন্ড খিদে পেয়েছিলো। খাবার টেবিলে বসে ভাত খেতে খেতে টের পেল অন্যদিনের মত কেউ ওর কাছে আসছে না। পাশের রুমে কি নিয়ে যেন শোরগোল হচ্ছে। মিজান কান পেতে শুনতে পেল ওর মা বলছে, 'এরকম করিস না। তোর আল্লাহর দোহাই লাগে।'
উত্তরে ওর ছোটবোন মুনিয়া বলছে, 'না না, কোনো ধর্ষকের সাথে এক বাড়িতে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব না৷ আমি নানুর বাসায় চলে যাচ্ছি। তোমার ধর্ষক ছেলে যতদিন আছে ততদিন ফিরব না।'
.
মিজানের কান দিয়ে ধোয়া বেরোতে থাকে কথাগুলো শুনে। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয় সশব্দে।
.
তিনদিন পর।
ধুমধাম করে সুপ্তির বিয়ে হচ্ছে। এলাকার সবাই দাওয়াত খেতে এসেছে। উচ্চস্বরে গান বাজছে। হৈ হুল্লোড় চলছে। খুব খুশি সবাই। শুধু খুশি না মিজান। সে বাসা থেকে বের হতে পারছে না। ছোট বাচ্চারা ওকে দেখলেই ধর্ষক ধর্ষক বলে চিল্লাচ্ছে। এলাকার মহিলাদের সামনে পড়ে তারা ওড়নায় মুখ ঢেকে মাটিতে থুতু ফেলছে। কোনো দোকান থেকে কোনোকিছু বিক্রি করছে না ওর কাছে। ও যে দল করতো, সেই দলের নেতারা বলছে মিজান আমাদের কেউ না। মিজান আসলে বিরোধী দলের সদস্য৷ দল থেকে বহিস্কার করা হয়েছে ওকে। কেউ কেস করলে হয়তো এতোক্ষণে পুলিশ ধরে নিয়ে যেত। কিন্তু কেউ ওর বিরুদ্ধে কেস করেনি। কিন্তু এর চেয়ে জেলও অনেক ভালো। নিজের এলাকায় থেকে মিজানের মনে হচ্ছে দুনিয়ার সবচেয়ে কঠিন জেলখানায় আছে ও।
.
একসপ্তাহ পর সুপ্তি যেদিন বরের সাথে হানিমুনে মালদ্বীপ গেল সেদিন দুপুরে মিজানকে ফাস নেয়া অবস্থায় তার ঘর থেকে উদ্ধার করে পুলিশ৷ জানাজায় কোনো লোক হয় না। ধর্ষকের জানাজা পড়তে কেউ রাজি না। সন্ধ্যার আগে আগে মিজানকে তড়িঘড়ি করে কবর দিয়ে দেয়া হয়। সুপ্তি তখন মালদ্বীপের এক রিসোর্টের ডাইনিং এ হাসিতে হাসতে মঈনের সাথে ডিনার করছিলো।

পরিশিষ্ট: গল্প এখানেই শেষ। গল্পটা পুরোপুরিই কাল্পনিক। বাস্তবে এরকম কিছু হয়না আমাদের সমাজে। এখানে সুপ্তিদের বিয়ে ভেঙে যায়। সমাজের সবাই বাকা চোখে দেখে। লজ্জায় অপমানে আত্মহত্যা করে সুপ্তিরা। আর মিজানরা মাথা উচু করে ঘুরে বেড়ায়। ওরা সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে। উঠতে বসতে সবাই ওদেরকে সালাম দেয়।

লেখক : সোহাইল রহমান


(গল্পটা এক বান্ধবী শেয়ার করেছে বলে পড়া। পড়ে মনে হল, এরকম দিন অবশ্যঅবশ্যই আসবে। আজ হয়ত সব কাল্পনিক, কাল বাস্তবায়িত হবে। ধর্ষিতার দিকে নয়, সেদিন শুধুমাত্র ধর্ষকের দিকে আঙুল তোলা হবে।)


*




0 Comments 33 Views
Comment

© FriendsDiary.NeT 2009- 2020