FriendsDiary.NeT | Friends| Inbox | Chat
Home»Archive»

স্বপ্ন

স্বপ্ন

*

গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া সুদীপ্তর গাড়িটা বেশ বেলা করেই এসে পৌঁছালো। গাড়ির ভেতর থেকে বলে উঠলো সুদীপ্ত চৌধুরী,"গ্রামকে তো চেনাই যাচ্ছেনা।এই কয়েক বছরে এত পরিবর্তন হবে সেটা ভাবতেই পারিনি!"সামনে থেকে ড্রাইভার রতনদা বলল,ডিজিটাল যুগ,পাল্টাবেই তো।"সুদীপ্তর চোখে ভেসে উঠছে তার শৈশবের দিনগুলো।মহা উৎসাহে বলল,জানো রতনদা এখানেই আমার শৈশব কেটেছে।ঐ যে সামনে স্কুলটা দেখা যাচ্ছে সেটাতেই পড়তাম। তখন,স্কুল পালিয়ে খালি মাঠে পড়ে থাকতাম। সেজন্য কত মার খেতে হয়েছে বাবার হাতে! রতনদা বলল, স্কুল পালানো আলাদা একটা মজা। বুঝলে, আমিও অনেক বার স্কুল পালিয়েছি। সুদীপ্ত বলল, আমি একা কখনো পালাইনি। সঙ্গে সুদীপ থাকতো সবসময়। রতনদা আগ্রহের ভঙ্গিতে বলল,কে এই সুদীপ? তোমার বন্ধু নাকি? সুদীপ্ত বলল, সুদীপ আমার একমাত্র বন্ধু ছিল।ওর নাম আর আমার নাম প্রায় একই ছিল।ওর নাম ছিল সুদীপ্ত চক্রবর্তী। খুব ভালো বোলিং করে ও। আমার এত বড় ক্রিকেটার হওয়ার পেছনে ওরই অবদান বেশি ছিল।স্কুল পালিয়ে তো মাঠে পড়ে ক্রিকেট খেলতাম।বলতে বলতে পুরানো স্মৃতিগুলো যেন মনে পড়ে গেল তার।সুদীপ্তকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে রতনদা বলল,ও তুমি এভাবেই ক্রিকেটার হয়েছো। আচ্ছা বাদ দাও, স্কুল মাঠেই তো সংবর্ধনা দেওয়া হবে তোমাকে।চলো যাওয়া যাক।গাড়িটা এগিয়ে চলেছে। সুদীপ্তর জীবন কত বিচিত্র ছিল! বাড়িতে নুন আনতে পান্তা ফুরাতো। বাবা ছিলেন স্কুল মাষ্টার। ছোটবেলা থেকেই তার আগ্রহ ছিল ক্রিকেটের প্রতি।মাঠে তার খেলা দেখে বড়লোক গোছের এক ভদ্রলোক তাকে নিয়ে গিয়েছিল শহরে।আজ সে খুব বড় একজন খেলোয়াড়!তার গ্রাম থেকে আজ সংবর্ধনা দেওয়া হবে তাকে, এরচেয়ে আনন্দের আর কী আছে?মাঠে পৌঁছে শুনা গেল, অনুষ্ঠান শুরু হতে আরো ২ ঘন্টার মতো বাকি। সুদীপ্ত বলল,চলো গ্রামটা ঘুরে আসা যাক রতনদা। রতনদা তখনই রাজি। গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে সুদীপ্ত বলল, উঁহু,গাড়িতে করে নয়। হেঁটে হেঁটে দেখবো। রতনদা অবাকই হয়ে যায়। রতনদা নেহাতই গরীব একজন লোক। তিনি যে সুদীপ্তর ড্রাইভার সেটা প্রায় সময় ভুলে যান সুদীপ্তর আচরণ দেখে। গ্রামের অধিকাংশ জায়গারই পরিবর্তন হয়েছে।ঘাসে ঢাকা মেঠোপথ গুলো পরিণত হয়েছে পিচ ঢালা রাস্তায়! গাছপালার সংখ্যা অনেক কমে গেছে। তেমন পাখির ডাকও শুনা যাচ্ছে না।কারো বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় দেখা যাচ্ছে, কোনো গৃহবধূ উঠোনে কাথা বিছিয়ে সেলাই করছেন।কোথাও বা ছেলেরা খুব আগ্রহ নিয়ে ক্যারম কিংবা মার্বেল খেলছে। অনেক বাড়ির সিঁড়িতে দেখা গেল কিছু মেয়েকে পুতুল নিয়ে খেলা করতে। দেখে মনে হয় থ্রি কিংবা ফোরে পড়ে!পথে-ঘাটে প্রায় এরকম দৃশ্যই দেখা গেল।একসময় হাঁটতে হাঁটতে একটা পুকুরের কাছাকাছি চলে আসলো দুজন। ঘাটের সিড়িতে বসে সুদীপ্ত বলল, এখানে খুব মজা করতাম আমরা। ছেলেগুলোকে দেখো, ওদের মতোই ডানপিঠে ছিলাম। রতনদা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালোই লাগছিলো তার। বেশ কয়েকজন কিছুক্ষণ পর পর ঝাঁপ দিচ্ছে পুকুরে।কেউ'বা বসে বসে চেঁচিয়ে উৎসাহ দিচ্ছে। সুদীপ্ত আর রতনদাকে তাদের নজরে পড়লো না।পানির ঝাপটায় প্রায় ভিজে যাচ্ছে তখন সুদীপ্ত উঠে বলল, সামনেই সুদীপের বাড়ি। আমি দেখা করে আসি।যাবে তুমি? রতনদা মাথা নেড়ে বলল, তুমি বরং যাও। আমি এদের কান্ড দেখি নিরাপদ জায়গায় থেকে! সুদীপ্ত এগিয়ে গেলো।মনে সন্দেহ ছিল ওটা সুদীপের বাড়ি কিনা। সেখানে যেতেই নিশ্চিত হয়ে গেল এটাই সুদীপের বাড়ি। সুদীপ বারান্দায় বসে ছিল।তাকে দেখেই বলে উঠলো, আরে বিখ্যাত ক্রিকেটার আমার বাড়িতে! আমি জানতাম তুই এখানে আসলে তোর বন্ধুকে ভুলে যাবি না। সুদীপ্ত বলল,সে কথা বাদ দে।তোকে তো চেনাই যাচ্ছেনা,কি অবস্থা করেছিস নিজের? সুদীপ অভিমানের স্বরে বলল, আমি কী আর তোর মতো বিখ্যাত লোক নাকি! আমি নেহাতই ছাপোষা লোক। সুদীপ্ত বলল, আচ্ছা একটা কথা বল। তুই তো দারুন বোলিং করিস। এখন খেলিস না কেন? তুই জানিস আমি ক্লাবের লিষ্টে তোর নামকে কত খুঁজেছি।মনে করেছিলাম তুইও নিশ্চই চান্স পেয়েছিস। বেশ মনমরা হয়ে কথাগুলো বলল সুদীপ্ত। সুদীপ গম্ভীর গলায় বলল,সে অনেক কথা। সেগুলো শুনার মতো সময় তোর নেই।তোকে না সংবর্ধনা দেওয়া হবে। সুদীপ্ত বলল, আমি চাই তুইও যাস আমার সাথে। তোর সেই যোগ্যতা আছে।কি যাবি তো? সুদীপ হেসে বলল,এত্ত বড় খেলোয়াড়ের কথা না রেখে পারবো? আমি চেষ্টা করবো। বেশ কিছুক্ষণ কথা হলো ওদের।রতনদার গলা শুনেই সুদীপ্ত বিদায় নিয়ে চলে আসলো…


মঞ্চে যেতেই সুদীপ্তর খুব গর্ব হতে লাগলো। বেশ কিছুক্ষণ বক্তব্য দিল এলাকার গন্যমান্যরা।সময় শেষ হতে লাগলো কিন্তু সুদীপের দেখা নেই। বেশ রাগ হলো তার উপর।সুদীপের আসার কথা অতিথিদেরও বলেছিল সে। এখন তারা কী মনে করবে!এতবড় অপমান হবে সেটা সুদীপ্ত ভাবতে পারেনি। অনুষ্ঠান শেষে ইচ্ছে করছিল সুদীপের বাড়ি যাওয়ার।সময় না থাকায় বেড়িয়ে পড়তে হলো।

গ্রাম থেকে বেড়োবার পথে হঠাৎ কে যেন ডাক দিল সুদীপ্তকে।হ্যা সুদীপের গলা!গাড়ি থেকে নেমে এদিক ওদিক দেখলো সে।একটা গাছে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সুদীপ।সুদীপ্তর মনে হলো,তাকে অপমান করে তার অবস্থা দেখতে এসেছে এখন সুদীপ। সামনে এগিয়ে বেশ কড়াভাবে বলল সুদীপ্ত_

- তুই আসলি না কেন?জানিস কীভাবে হাসির পাত্র হয়েছি আমি?
- একটা সমস্যায় পড়েছিলাম। সেজন্য আসতে পারিনি।
- তখনই বলে দেওয়া উচিত ছিল তোর। আমাকে খুব অপমানিত হতে হয়েছে।
- তুই শুধু শুধু রেগে যাচ্ছিস আমার উপর…
- আমি শুধু শুধু রাগ করছি না।তোকে না নিয়ে আমাকে নিয়ে গিয়েছিল দেখে খুব হিংসা হচ্ছিল তোর?যার জন্য তুই এভাবে প্রতিশোধ নিলি!
- আমি তোর উপর কোনো রাগ পুষে রাখিনি। তুই আমার বেষ্ট ফ্রেন্ড ছিলি। তোর সাফল্য মানে আমার সাফল্য।
- তাহলে তুই এরকম করলি কেন?
- আজ আমি তোকে একটা সত্যি কথা বলার জন্য এসেছি।
- কী?
- সেদিন ঐ ভদ্রলোক কার খেলা দেখে আশ্চর্য হয়েছিল জানিস?
- কার?, নির্লিপ্ত ভাবে বললো সুদীপ্ত।
- ঐ ভদ্রলোকটি সুদীপ্ত চৌধুরীকে না সুদীপ্ত চক্রবর্তীকে নিতে এসেছিল।
- মানে!কী বলছিস তুই?
- আমি ঠিকই বলছি। খেলার মাঠে তার সহকারীর সাথে আমার কথা হয়েছিল। কিন্তু আমাকে নিতে তিনি নিজে এসেছিলেন।এই গ্রামে সবাই আমাকে সুদীপ হিসেবে চেনে।তাই সুদীপ্ত নাম জিজ্ঞাসা করায় পাড়ার কলিম চাচা মনে করেছিল তোকে।
- মানছি ওটা ভুল ছিল যে ওনি নিজেও একবার বলেছিলেন আমায়, তুমি বোলিংয়ে এক্সপার্ট তাই না? আমি না বলাতে তিনি খুব আশ্চর্য হয়েছিলেন। তুই তো যোগাযোগ করতে পারতিস।করিসনি কেন? - তুই ঐ সময়ের অবস্থা জানতি।প্রায় ৩০ বছর আগের কথা। তখন মোবাইল তত সহজলভ্য ছিল না। যোগাযোগের জন্য সবচেয়ে সহজ মাধ্যম ছিল রেলপথ।
- তাহলে তো পরদিন যেতেই পারতিস!
- সে চেষ্টা কি করিনি। সেদিন রাত্রেই আমি ছুটেছিলাম স্টেশনের দিকে। ভেবেছিলাম পরে টিকিট নিয়ে নেবো। কিন্তু উঠার পর পকেটে হাত দিয়ে দেখি টাকা নেই! কোথায় যেন পড়ে গেছে।তার ফলে গার্ড আমার কথা না শুনে চলন্ত গাড়ি থেকে… - মানে?, সুদীপ্ত অবাক! গাছের আড়াল থেকে কী একটা বের করলো সুদীপ। তখন সন্ধ্যা হবে হবে। আবছা অন্ধকার চারপাশে।তার মধ্যে সুদীপ্ত দেখতে পেলো ওটা লাঠি জাতীয় কিছু।সেটার উপর ভর দিয়ে সুদীপ এগিয়ে আসতে লাগলো। এবার বুঝতে অসুবিধা হলো না সুদীপ্তর!ওটা ক্রাচ! সেদিনের দূর্ঘটনায় সুদীপের পায়ে সমস্যা হয়েছে। সুদীপ্ত দেখতে পেলো সুদীপ বাচ্চা ছেলের মতো কাঁদছে, আমার স্বপ্নটা চুরমার হয়ে গেল। ক্রিকেট শব্দটা শুনলেই আমার সেই পুরোনো দুঃখটা মাথাচাড়া দিয়ে। আচ্ছা আমি আসি রে! তোর অনেক সময় নষ্ট করলাম। অন্ধকার নেমে এসেছে।সুদীপ্তর মনে হতে লাগল চারপাশের গাছগুলো যেন তাকে বিদ্রুপ করছে! এদিকে সুদীপ অনেকটা পথ এগিয়ে গেছে। সুদীপ্ত চেঁচিয়ে উঠলো, সুদীপ দাড়া।রতনদার হাতে স্ক্রেচগুলো দিয়ে বলল, আমি থাকতে তোর স্বপ্ন চুরমার হবে না। আমি তোর অপারেশন করাবো।দুজনের কাঁধে ভর দিয়ে দিয়ে বিনা বাক্যব্যয়ে চলতে লাগলো সুদীপ্ত।গাড়িতে উঠে শুধু একটা কথাই বলল, আমার স্বপ্ন সত্যি পূরণ হবে তো? সুদীপ্ত বলল, তোর স্বপ্ন পূরণ হবেই সুদীপ। রতনদা ততক্ষণে গাড়িটা চালাতে শুরু করেছে। অন্ধকার ভেদ করে গাড়িটা এগিয়ে যাচ্ছে শহরের দিকে কিংবা স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে!…


*




4 Comments 45 Views
Comment

© FriendsDiary.NeT 2009- 2020